সংস্কারের নামে লাকসাম রেলওয়ে জংশনে লাখ লাখ টাকা লুটপাটের অভিযোগ


সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ২৬ আগস্ট ২০১০ (কুমিল্লাওয়েব ডটকম) :
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে জংশন লাকসামে সংস্কারের নামে লাখ লাখ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। ‘কত লাকসাম কত বাতি’ খ্যাত এ প্রবাদের জংশনের ঐতিহ্য এখন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা আর দূর্নীতি ধ্বংস করে দিচ্ছে লাকসাম জংশনের সেই ঐতিহ্যকে। রেলওয়ের একজন কর্মচারী হতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত নানা দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় এ জংশনে তেমন কোন উন্নয়নের পরিবর্তন ঘটেনি। সম্প্রতি লাকসাম রেলওয়ে জংশনের দু’টি বাংলো, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অফিস ভবন ও রেলওয়ের বেতন অফিস মেরামতের জন্য চট্টগ্রামের মেসার্স রাব্বী এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছিলো। ওই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে মেরামতের কাজ দেয়া হলেও মূলতঃ ওই কাজ করেছেন সংশ্লিষ্ট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তা। আর তারাই লুটে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। নামে মাত্র কিছু চুনকাম, ছাউনীর ঢেউটিন পরিবর্তন ও বাংলোর ভিতরে-বাইরে কিছু অংশে রং দিয়ে ঘষা মাজা করেই বিল তৈরী করে নিজেদের পকেট ভারী করেছেন। লাকসাম রেলওয়ে জংশনের দু’টি বাংলো ও দু’টি অফিস মেরামতের নামে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তার ২০ ভাগ কাজও ঠিকাদার সম্পূর্ণ করেনি বলে রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেছে। এতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে রেলওয়ের অসংখ্য কর্মকর্তা কর্মচারী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেলওয়ে কর্মকর্তা জানান, ঠিকাদার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হতে নিম্ন পর্যন্ত কর্তা ব্যক্তিদের ঘুষ দিতে দিতে অবশিষ্ট যা ছিল তার অর্ধেক দিয়েই ওই ঘষা মাজার কাজগুলো শেষ করেছেন। এতে মেরামতের নামে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের পকেট ভারী করেছেন। আরেক কর্মকর্তা জানান, সরকারী এসব কাজে যারা তদারকী করেছেন তারাই ঠিকাদার থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে নামে মাত্র মেরামতের কাজ করেছেন।

মেরামতকৃত এল-৬ নামের বাংলোয় বসবাসকারী রেলওয়ের এস.এস.এ.ই/ এল.আর, পাহাড়তলীর এবিএম আতিকুর রহমান জানান, আমার বাংলোয় মেরামতের নামে কয়েকটি নিম্ন মানের ঢেউটিন পরিবর্তন, রং দিয়ে কিছু চুনকাম ও ঘষা মাজার কাজ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন মেরামত করা হয়নি। পূর্বের অবস্থাতেই বাংলোটি রয়ে গেছে। বরং মেরামতের পূর্বে আমার নিজ খরচে বাংলোটির অধিকাংশ কাজ আমি নিজেই করেছি। এ বিষয়ে তিনি চট্টগ্রাম রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১, প্রধান প্রকৌশলী, বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার, ডি.এম.ই/লোকো ও এ.ই.এন/ কুমিল্লাকে গত ২৭-০৭-২০১০ইং লিখিতভাবে অভিযোগ করেছেন বলে জানান। এছাড়া, লোকো কলনীর ই-৬১ জেড টাইপের বাংলোটির একই রকমভাবে মেরামতের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা। ওই বাসায় বসবাসকারী রেলওয়ের এ.এল.এম আবদুল লতিফ জানান উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজসে ঠিকাদার বাসা মেরামতের নামে বরাদ্দকৃত সরকারী টাকা লুটপাট করে নিয়েছে। তিনি জানান, ওই কাজের তদারকী করেছেন উর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পূর্ত) অফিস। বাংলোর সামনে উর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পূর্ত) অফিস ও কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও কি করে এমন ধরনের কাজ হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাই জানেন।

এদিকে, লাকসাম রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ইনচার্জ তপন কান্তি সাহা তার অফিস মেরামতের অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন অফিসের ভিতরে বাহিরে ঠিকাদার কিছু চুনকাম বাউন্ডারী ওয়াল নির্মান ও জানালা দরজার সামান্য কাজ করে চলে গেছে। কি ধরনের কাজের সিডিউল ছিল তা আমাদেরকে দেখানো বা জানানো হয়নি। তবে মানসম্মত কোন মেরামত কাজ হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। রেলওয়ে বেতন বিতরন অফিসের অফিস সহকারী লিয়াকত আলী জানান, আমাদের বেতন অফিসের দরজা জানালা আগের গুলোই রয়েছে। তেমন কোন মেরামত করা হয়নি। শুধুমাত্র ভাউন্ডারী ওয়াল নির্মান করে একটু রংয়ের প্রলেপ দিয়ে চলে গেছে ঠিকাদার। ভাউন্ডারী ওয়াল নির্মানে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা ব্যাপক দূর্নীতি ও অনিয়ম করে সরকারের ব্যাপক টাকা ক্ষতি সাধন করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মচারী জানান, ওই কাজের মান নিয়ে অভিযোগ করায় ঠিকাদার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিয়ে আমাদের বদলীর হুমকি দিচ্ছেন।

এ সকল অভিযোগ সম্পর্কে লাকসাম রেলওয়ে পূর্ত বিভাগের উর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু হানিফ পাশার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে প্রথমে অনিহা প্রকাশ করেন। পরে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নাম ও কত টাকা বরাদ্দে মেরামতের কাজ করা হয়েছে জানতে চাহিলে এবিষয়ে তিনি কোন সদত্তোর দিতে পারেনি। তবে তিনি সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন। আবু হানিফ পাশা আরো বলেন, আমার অফিস ওই কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকলেও এটা ছিল নামে মাত্র। মূলতঃ এ কাজের সকল তদারকী করেছেন ডি.ই.এন-১ চট্টগ্রাম ও এ.ই.এন কুমিল্লা। তারাই সকল বিষয়ে অবগত আছেন।

একটি সূত্রে জানা গেছে, লাকসাম রেলওয়ের উর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পূর্ত) আবু হানিফ পাশা ঠিকাদারের কাছ থেকে মেরামতের দায়িত্ব নিয়ে নিজেই রেলওয়ের মালামাল দিয়ে নামে মাত্র মেরামত কাজ করেছেন। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজে রাখায় তিনি এখানে প্রভাব খাটিয়ে চলছেন।

রেলওয়ের এ.ই.এন/কুমিল্লা সামছুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়া মাত্র তিনি কোন কথা বলতে রাজী হননি। পরে একাধিকবার তাকে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।

এদিকে, চট্টগ্রাম রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ আবুল কালাম আজাদ চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কোন কাজ অসম্পূর্ণ করে রাখলে তাকে দিয়ে পূনরায় কাজ করিয়ে নিব। তবে উর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পূর্ত) লাকসাম এ বিষয়ে কোন তাকে কিছুই বলেননি। যদি এমন কোন দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়ে থাকে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান রাব্বী এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারী বাবুল জানান, লাকসামের উর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পূর্ত) আবু হানিফ পাশা ওই কাজগুলো আমার কাছ থেকে সাব কন্ট্রাক্ট নিয়ে করেছেন। কাজের মান কী রকম হয়েছে তা তিনি জানে না। তবে তিনি এবিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।

Check Also

নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর ১১২তম মৃত্যু বার্ষিকী পালন

স্টাফ রিপোর্টার :– নানা কর্মসূচী পালনের মধ্যদিয়ে কুমিল্লার লাকসামে নারী জাগরণের অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর ...

Leave a Reply