কুমিল্লায় পুলিশ-জনতা সংঘর্ষ ২৩ গ্রামে গ্রেফতার আতংক : তালিকা করে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ২৬ আগস্ট ২০১০ (কুমিল্লাওয়েব ডটকম) :
ঘটনাস্থল কুমিল্লা জেলা সদরের অদূরে সদর দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ারা ইউনিয়নের কালিরবাজার গ্রাম। কিন্তু মামলায় আসামী করা হয়েছে ২৩ গ্রামের সহস্রাধিক লোকের বিরুদ্ধে। তাই গ্রেফতার আতংকে বর্তমানে ২৩ গ্রামের মানুষে মাঝে আসন্ন ঈদের আনন্দের লেশ মাত্রও নেই। গত ২০ জুলাই রাতের রাতের ঘটনা। ছেলেধরা সন্দেহে লোকজন সাদা পোশাকধারী পুলিশকে লাঞ্ছিত করে। ৬ ঘন্টা অবরুদ্ধ রেখে পুলিশের ব্যবহৃত নম্বরবিহীন একটি মাইক্রোবাস ভাংচুর করা হয়। এ ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মী, শিক্ষক-প্রভাষক, ডাক্তার, পৌর কমিশনার, চাকুরীজীবি, দরিদ্র লোকজনসহ রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ২৩ গ্রামের সহস্রাধিক লোকের বিরুদ্ধে পর দিন বিকালে পুলিশ বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করে। এ ঘটনায় গ্রেফতার আতংকে ওই এলাকার লোকজন এলাকাছাড়া রয়েছে। ওই মামলায় ৫৪ জনকে এফআইআরভূক্ত ও অজ্ঞাতনামা ১০০০/১২০০ জনকে আসামী করা হয়। ফলে ঈদের আনন্দ নেই ওই ২৩টি গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে। এরই মধ্যে পুলিশ গ্রেফতার করেছে ৭ জনকে।

এলাকার লোকজন জানায়, ২০ জুলাই রাত ৮টায় দুই ব্যক্তি নম্বরবিহীন একটি সাদা মাইক্রোবাস নিয়ে সদর দক্ষিণ উপজেলার পশ্চিম জোরকানন ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী উত্তর ভাগালপুর গ্রাম দিয়ে যাওয়ার পথে ওই গ্রামে রাস্তার পাশে দুলাল (২০), তার ছোট ভাই ৭ম শ্রেণীর ছাত্র রাব্বী (১২), খোকন (৩০) ও নুরুল ইসলাম (৩২)কে বসে থাকতে দেখে তাদেরকে ওই মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। এ সময় স্থানীয় জনতা ছেলেধরা সন্দেহে ডাক-চিৎকার দিয়ে ধাওয়া করে ওই মাইক্রোবাসসহ ২ জনকে আটকপূর্বক গলিয়ারা ইউনিয়নের কালিরবাজার মাদ্রাসায় নিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। উত্তেজিত জনতার হাতে অবরুদ্ধ দু’ ব্যক্তি সোহেল মাহমুদ ও সাইফুল নিজেদেরকে সদর দক্ষিণ মডেল থানা পুলিশের এসআই বলে পরিচয় দেয় এবং ওই ৪ জনকে সন্ধিগ্ধ আসামী হিসাবে আটক করা হয় বলে তারা জানায়। খবর পেয়ে সদর দক্ষিণ মডেল থানা পুলিশের এসআই মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে ৬ এসআই ওই ২ এসআইকে উদ্ধারের জন্য ঘটনাস্থলে এবং পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে জনতাও তাদেরকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। । রাত প্রায় সাড়ে ১২টায় দাঙ্গা পুলিশ নিয়ে থানার ওসি ও জেলার উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। এ সময় তারা ৩৮ রাউন্ড শর্টগানের ফাঁকা গুলি ছুড়ে ও ব্যাপক লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে অবরুদ্ধ ৮ পুলিশকে উদ্ধার করে রাত প্রায় ২টায় থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পরদিন ২১ জুলাই বুধবার বিকালে সদর দক্ষিণ থানার এসআই আ.ফ.ম সোহেল মাহমুদ বাদী হয়ে বিএনপি নেতা জহিরুল ইসলাম স্বপনসহ ৫৩ জনকে এফআইআরভূক্ত ও অজ্ঞাতনামা আরও ১০০০/১২০০ জনকে আসামী করে মামলা নং-৩৯/১০ দায়ের করেন। জানা যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য যারা ভূমিকা পালন করেছে তাদেরকেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় এ মামলায় আসামী করা হয়েছে। এছাড়া ওই দিন এলাকায় না থাকা শিক্ষকসহ অনেক লোককে আসামীভূক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। রাত ৮টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনায় দায়ের করা ঐ মামলায় উত্তর ও দক্ষিণ ভাগালপুর, কালিরবাজার, খোন্দারগোড়া, লামপুর, ভাটপাড়া, তালপট্টি গোয়ালগাঁও, মেরুলিয়া, মুড়াপাড়া, নির্ভয়পুর, জগপুর, দড়িবটগ্রাম, নোয়াগ্রাম, কনেশতলা, উলুরচর (মোহাম্মদপুর), সুবর্ণপুর, বল্লবপুর, গোয়ালগাঁও, বাউবন ও ধনপুরসহ সদর দক্ষিণ উপজেলার ২০টি গ্রামের ৫৪ জনকে আসামী করা হয়। ওই মামলায় আসামীভূক্তি এবং নাম বাদ দেয়ার ভয়ভীতি প্রদর্শণে সরকার দলীয় একটি প্রভাবশালী মহল পুলিশের সাথে যোগসাজসে গোপন সমঝোতায় প্রতিটি এলাকায় মোটা অংকের চাঁদাবাজীতে জড়িয়ে পড়েছে বলে এসব গ্রামের লোকজন অভিযোগ করেন। এ ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ সুপারের নিকট আবেদন জানিয়েছেন পৌর কমিশনার সহিদুল ইসলাম, পশ্চিম জোরকানন ইউপির চেয়ারম্যান মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী ও জোড়কানন পূর্ব ইউপি চেয়্যারম্যান সৈয়দ শাহনেয়াজ। এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোয়াজ্জেম হোসেন গতকাল মঙ্গলবার জানান এ মামলায় এজাহারনামীয় সুবর্ণপুরের আল আমিন (২৬), দরিবট গ্রামের তাজুল ইসলাম (২৫) এবং এজাহার বহির্ভূত ৫ জন মোহাম্মদপুর গ্রামের মনির হোসেন (৪০), বড়বামিশার জাকির হোসেন (৪০), কাজীপাড়ার হাসান (৩০), একবালিয়ার মীর হোসেন (২০) ও উত্তর ভাগলপুরের জাহিদুল ইসলাম (১৮)সহ ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা জেলহাজতে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘটনার সাথে জড়িত ১৪৭ জনের একটি তালিকা করা হয়েছে। হয়রানী ও চাঁদাবাজীর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ভাংচুর করা মাইক্রোবাসের মূল্য আদায়ের জন্য পূর্ব/পশ্চিম জোরকানন ও গলিয়ারা এই ৩ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দায়িত্ব নিয়েছে। আর এজন্যে ওই এলাকার ২২ জন চোরাকারবারীরও একটি তালিকা করা হয়েছে। এলাকার লোকজনকে হয়রানীর অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। পুলিশ সুপার মোহাঃ শফিকুল ইসলাম যুগান্তর কে জানান , ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের ছবি মোবাইল ফোন ও ক্যামেরায় ধারণ করা আছে। এগুলো দেখে ও গোপন প্রকাশ্য তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অহেতুক কেউ হয়রানীর শিকার হবে না বলে তিনি জানান।

Check Also

কুসিক নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করার দাবি বিএনপির

সৌরভ মাহমুদ হারুন :– কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার ...

Leave a Reply