অপরাধ হলো তারা নারী


মিলন আহমেদ
একটি সংবাদ অধিকাংশ পত্রিকাই ছাপেনি। গত ২৫ জুলাই তারিখে দু’একটি পত্রিকা ছেপেছে তাও আবার ভিতরের পাতায় ছোট করে। খবরটির গুরুত্ব কি এতই কম? আসলে কতজন নারী একসাথে ধর্ষিত হলে সংবাদপত্রগুলোর কাছে গুরুত্ব পাবে, তা বুঝে উঠা মুশকিল। অসহায় নারীর বুকফাটা আর্তনাদ আমাদের মিডিয়াগুলো কতটুকু শুনতে পায় এ ঘটনা থেকে তারও একটি প্রমাণ পাওয়া যায়। ঘটনার শুরুটা এমন- কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারীঝার ইউনিয়নের ধাউরারকুঠি গ্রামে এক গৃহবধূকে তার স্বামী পিটিয়ে মারাত্মক জখম করেছে। খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। বউকে স্বামী পিটিয়েছে এটা কোন খবর নয়, সংবাদের মূল ঘটনাটি ঘটেছে তার পরে। সকালে নাস্তার পর এককাপ চা খাওয়ার মতই স্বাভাবিক এদেশে বউ পেটানো। তবে কি তা হালের বলদ পেটানোর মত স্বাভাবিক ? সঠিক উত্তর হবে ‘না’। হালের বলদ পেটানোর পর তার প্রভূ ঠিকমত খেতে দেয় এবং চিকিৎসা করায়। এই কারণে চিকিৎসা করায় যে, মারা গেলে ২৫/৩০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়ে যাবে। ঠিকমত খেতে দেয় কারণ শরীর নষ্ট হয়ে গেলে দাম কমে যাবে এবং লোকসান হবে। কিন্তু বউ পেটানোর পর তার প্রভূ (যেহেতু স্বামী শব্দের অর্থ প্রভূ) তাকে চিকিৎসা করায় না। এই কারণে চিকিৎসা করায় না যে, মরে গেলে দেখেশুনে নতুন আর একটা বউ ঘরে আনা সহজ হবে। তাই একটা কথা এদেশে চালু আছে, ‘ভাগ্যবানের বউ মরে, অভাগার মরে গরু।’
কাজেই অত্যšত স্বাভাবিক কারণেই ভূরুঙ্গামারীর উক্ত স্বামী গুরুতর অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসা করায়নি। মেয়ের চরম দূরাবস্থা সহ্য করতে না পেরে ওই গৃহবধূর মা তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান এবং ভর্তি করান। মা নিজেও একজন অসহায় নারী। অসুস্থ মেয়ের সেবা-শুশ্রষা করার জন্য রাতে তিনি পাশেই থাকবেন। ইতিমধ্যে হাসপাতালের নৈশ প্রহরী আবুল কাশেম গৃহবধূর মাকেও হাসপাতালে ভর্তি হতে বলে। ভর্তি না হলে রাতে রোগীর কাছে থাকতে দেয়া হবে না বলে ভয় দেখায়। তার কথামত মেয়ের পাশের বেডে রোগী হিসাবে ভর্তি হন ওই মা। অত্যাচারিত, অসহায় এবং অসুস্থ মেয়ের পাশে বৃহস্পতিবার রাতে ভূরুঙ্গামারী হাসপাতালে ছিলেন একজন মা, একজন জননী। মেয়ের জামাই, হাসপাতালের নৈশ প্রহরী, ডাক্তার এবং পুলিশ সবই যে একই গোত্রভূক্ত তা হয়তো ওই মা জানতেন কিন্তু ঐ মূহুর্তে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। নিজের সন্তানকে গুরুতর অসুস্থ দেখলে সব মা-ই দিশেহারা হয়ে যান। তাই ওই মুহুর্তে তিনি সবাইকে মানুষই ভেবেছিেেলন। মানুষ মানেই মানবিক গুনাবলী সম্পন্ন জীব। কিন্তু রাত ১২ টার দিকে বিদ্যুৎ চলে গেলে নৈশ প্রহরী আবুল কাশেম ওই মাকে মশারী দেয়ার কথা বলে হাসপাতালের ছাদে নিয়ে যায় এবং সেখানে ধর্ষণ করে। হায়রে হাসপাতাল! হায়রে দেশ! কি অপরাধ মা এবং মেয়ের ? অপরাধ একটাই, তাহলো তারা নারী। সেই ১৯৪৯ সালে সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছেন “ কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং হয়ে উঠে নারী।” সে কারণে সমাজ এবং রাষ্ট্র ওই মা এবং মেয়েকে বলছে, তোমরা নারী তাই তোমাদের ধর্ষিত, লাঞ্চিত, অত্যাচারিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিগৃহীত সবই হতে হবে। হাসপাতাল, থানা-পুলিশ, সমাজপতি সবই যে ধর্ষকের পক্ষে তার প্রমাণ পাওয়া যায় ডাক্তার এবং পুলিশের ভূমিকায়। ঘটনার পরদিন শুক্রবার সকালে হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার মোঃ তোফাজ্জল হোসেনকে অভিযোগ করা হলে শনিবারে বিষয়টি মীমাংসা করে দেবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। কি আশ্চর্য ডাক্তার! এ ঘটনার কি মীমাংসা করবেন তিনি? কোনটি মীমাংসার যোগ্য ঘটনা আর কোনটি নয় সে সম্পর্কে তিনি খুব ভালমতোই জানেন। কার টাকায় উনি ডাক্তার হয়েছেন এবং কার টাকায় বেতন পান তাও উনি জানেন। গার্মেন্টস এর মহিলা শ্রমিকদের ঘামেভেজা টাকায় মেডিক্যাল কলেজ, হাসপাতালসহ সকল সরকারী কর্মকান্ড চলে। উনি আবার বলেছেন, বিষয়টি মৌখিকভাবে শুনেছি তবে লিখিত অভিযোগ পাইনি। এসব হচ্ছে তামাশা করা, মশ্করা করা। প্রকৃতপক্ষে নৈশ প্রহরীর চাইতে ওইসব ডাক্তাররাও কম অপরাধী বলে মনে হয় না। ঘটনার এখানেই শেষ নয়, একটি চক্রকে দিয়ে ওই ধর্ষিতা মা কে গুম করে রাখা হয়েছে। সবই সম্ভব এদেশে। হাসপাতালে ভর্তি দেখানো হয়েছে অথচ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এ ব্যাপারে হাসপাতাল কতৃপক্ষ কোন জিডি করেন নাই। ঘটনাগুলি সম্পর্কে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মোনায়েম কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন থানায় কেউ মামলা দায়ের করেনি। স্বামী কর্তৃক মারাত্মক জখম, নৈশ প্রহরী কর্তৃক রোগীর মা ধর্ষণ এবং শেষে ভিকটিমকে গুম করে রাখা- এতগুলো ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তারপরও কেহ মামলা দিয়ে যাবে কি না তার জন্যে অপেক্ষা করছে আমাদের পুলিশ। এই হল ৩০ লক্ষ শহীদের এবং দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ। রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রের কারণে সারাদেশে নারী আজ চরমভাবে বঞ্চিত এবং অবহেলিত। সেদিন আমার এক পাঠক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র কি? উত্তরে আমি বলেছিলাম- যে রাষ্ট্রের পারিবারিক আইনে পূত্রের অধিকার কন্যার অধিকার অপেক্ষা বেশি তাকে পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে। বাংলাদেশ তার একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ। নারীর উপর যত অত্যাচারের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে তার খুব কমই পত্রিকায় আসে। তারপরও প্রতিদিনের সংবাদপত্রে প্রচুর নারী নির্যাতনের খবর আমরা দেখছি। ভূরুঙ্গামারীর এই ঘটনা প্রকাশের দিনও নারীর প্রতি নির্যাতনমূলক আরও অনেক ঘটনাই পত্রিকায় এসেছে। একই দিনে মতলব দক্ষিণ উপজেলায় নাজমূল নামের এক ব্যক্তি কর্তৃক তার স্ত্রী ও কন্যাকে হত্যা করার খবর এবং চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানায় ইউসুফ (৪৫) নামের এক ব্যক্তি কতৃক সাত বছরের শিশু ধর্ষিত হওয়ার খবর প্রকাশ হয়েছে। বাগেরহাট শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় শিউলি বেগম নামের এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা এবং স্বামী পলাতকের খবর ছাড়াও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ভোলাহাট জামবাড়ীয়া শাখার ম্যানেজার কতৃক কিশোরী ধর্ষণের খবরও একই দিনের পত্রিকায় ছিল। বেনাপোলের সাদীপুর সীমাšেত পাচারকালে দু’জন নারী ও একজন শিশুসহ পাচারকারী আটকের খবর এবং কোটালীপাড়ার তারাকান্দা গ্রামে পাষন্ড স্বামীর দেয়া আগুনে পুড়ে আট মাসের অšতঃসত্ত্বার মৃত্যুর কোলো ঢলে পড়ার খবরও একই দিনের পত্রিকা বহন করছিল । কাজেই ভোরে সূর্য উঠলেই বুঝতে হবে আজও বহু নারীকে পুরুষের অত্যাচারের বলি হতে হবে এবং তার সামান্য কিছু পত্রিকায়ও আসবে।
স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে নারী-পুুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের ন্যূনতম মানবিক অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব; তাই ২০২০ সালের মধ্যে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে নারীর গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ন অবশ্যম্ভাবী, এবং সেজন্য নারী-পুরুষের কর্তৃত্বগত বৈষম্য দুর করার জন্য এমপোর আলোকে ১১ দফা অনুযায়ী সর্বস্তরের সরকারে নারীর গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নের কোন বিকল্প নেই।

– লেখক :
প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), খিদিরপুর ডিগ্রী কলেজ, ইশ্বরদি শহর, পাবনা জেলা।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply