ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফুটবল খেলা নিয়ে সংঘর্ষ পুলিশসহ আহত শতাধিক


ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ০৬ আগস্ট ২০১০ (কুমিল্লাওয়েব ডটকম) :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফুটবল খেলা নিয়ে আবারো ভয়াবহ সংঘর্ষের সময় দেশের পূর্বাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকার ৪ ঘন্টা ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ থাকে। বন্ধ হয়ে যায় এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সংঘর্ষে পুলিশসহ শতাধিক লোক আহত হয়। সহিংসতা বন্ধে পুলিশ শ’ রাউন্ড টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। তারপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। পরিস্থিতি সামাল দেয় র‌্যাব-৯ এর সদস্যরা। ফুটবল খেলা নিয়ে বুধবার বিকেলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় সদর উপজেলার পাঘাচং ও চানপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে । সেদিন বিকেল থেকে রাত প্রায় ৯টা নাগাদ সংঘর্ষ চলে। তাতে আহত হয় অর্ধশত লোক।
বৃহষ্পতিবার বিকেল ৪টায় ঐ ঘটনার মিমাংসার কথা ছিল। তাতে স্থানীয় সর্দার ও মাতব্বরদের তালিকাও হয়। কিন্তু সকাল প্রায় পৌনে ৯টায় দু’পক্ষের সহিংসতা শুরু হয়। মসজিদের মাইক থেকে সংঘর্ষে আসার জন্য আহবান জানানো হয়। এতে ৭টি গ্রামের কয়েক হাজার লাঠিয়াল অংশ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, এ সময় ৪/৫শ রামদা নিয়ে সশস্ত্র লাঠিয়ালরা একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্থানীয় গ্রামবাসী জানায়, চান্দপুর তমিজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কোন গ্রামের ছেলেরা ফুটবল খেলবে, এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে চান্দপুর ও পাঘাচং গ্রামের ছেলেদের মধ্যে উত্তেজনা চলে আসছিল। মূলত এর জের ধরেই বুধবার উভয় গ্রামের লোকজন প্রথম দফায় সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। গতকাল আবারো সংঘর্ষে লিপ্ত হয় দু’পক্ষের দাঙ্গাবাজরা। এ সময় চান্দপুর বাজারের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তা ঘাটে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দু’গ্রুপ দা, লাঠি, বলম, কিরিচ, রামদা, মুলি বাঁশ নিয়ে একে অপরের উপর হামলে পড়ে, পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। চান্দপুর গ্রামের পক্ষে অবস্থান নেয় গজারিয়া, ভাটপাড়া, ফুলবাড়িয়া, জগতসার এবং পাঘাচং গ্রামের পক্ষে আটলা ও আশপাশ অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের লোকজন। ঘটনাস্থলের পাশে রেল লাইন হওয়ায় রেল লাইনের উপর থেকে পাথর নিয়ে বৃষ্টির মত পাথর ছুড়তে থাকে, এ কারণেই রাজধানী ঢাকার সংগে দেশের পূর্বাঞ্চলের সকল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সংঘর্ষের কারণে ঢাকা থেকে ছেড়ে সিলেটগামী আন্তঃনগর পারাবত, ঢাকাগামী সূবর্ণ এক্সপ্রেস, চট্টগ্রামগামী মহানগর ও নোয়াখালীগামী উপকূলসহ আরও কয়েকটি আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেন বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সংঘর্ষের সময় লুটপাটের মহোৎসব চলতে থাকে। চানপুর বাজারে অন্তত ৩০ দোকান কুপিয়ে লণ্ডভণ্ড করে ফেলে লাঠিয়ালরা। চালানো হয় লুটতরাজ। দোকানের আসবাবপত্র সহ সকল মালামাল নিয়ে যায় তারা। প্রত্যক্ষদর্শী আশিকুর রহমান জানান, তাদের হাতে ছিল ৪/৫শ রামদা। তিনি অভিযোগ করেন, উচ্চ পদস্থ এক মহিলা সরকারি কর্মকর্তা প্রভাব বিস্তার করায় পুলিশ একতরফা ভাবে পাঘাচং গ্রামের লোকজনের উপর অ্যাকশন নেয়। সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, তিতাস হোটেল এন্ড রেষ্টুরেন্ট ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে সন্ত্রাসী লাঠিয়ালরা। এ প্রতিষ্ঠানের অবশিষ্ট কোন কিছুই নেই। প্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে খাদেজা বেগম চিৎকার করে বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন। ১০/১২ লাখ টাকা ব্যয়ে বছর খানেক আগে তার স্বামী এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পাঘাচং দক্ষিণপাড়া গ্রামের হাবিবুর রহমান জানান, চানপুর বাজারে তার ৫টি দোকানই লুট হয়েছে। ভাংচুর হয়েছে ৫ ভাইয়ের বাড়িও। ব্যবসায়ী ফোরকান আলী বলেন, কোন রকম রেল লাইন পার হই। এরপর দেখি শত শত লোক সশস্ত্র অবস্থায় রেল লাইন দিয়ে ধেয়ে আসছে। কোন রকম জান নিয়ে আসি। তিনি অভিযোগ করেন ক্ষয়Ñক্ষতি যা হয়েছে এর দায়-দায়িত্ব পুলিশের। কারণ পুলিশ একতরফা ভাবে অ্যাকশন নেয়।
ঘটনাস্থলে অবস্থানকারী র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ভয়াবহ লুটপাট হয়েছে সংঘর্ষের সময়। যে যা পেয়েছে তা নিয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম, অপারেশন অফিসার মাহবুব হোসেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যর্থ হয়। এরপর এএসপি সদর সার্কেল সঞ্জয় সরকার অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে সেখানে যান। হাজার হাজার দাঙ্গাবাজদের নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম জানান, তিনিসহ অন্তত ৫/৭জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সহিংসতার মোকাবেলায় পুলিশ অন্ততঃ ৫ শত টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়েছে। বাতাস অনুকূলে না থাকায় বিপুল সংখ্যক টিয়ার সেল নিক্ষেপ করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। দুপুর প্রায় ১টায় র‌্যাব-৯ এর ভৈরব ক্যাম্পের ডিএডি মোঃ করিম উলাহ র‌্যাব সদস্যদের নিয়ে অকুস্থলে পৌঁছেন। তিনি জানান, সেই সময়েও ত্রিমুখী সংঘর্ষ চলছিল। র‌্যাবের এ্যাকশনের পরই দাঙ্গাবাজরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তিনি ব্যাপক লুটপাটের কথা স্বীকার করেন। শতাধিক লোক আহত হয়েছে বলেও জানান। র‌্যাবের উপস্থিতির পর পরই বেলা ১টায় ট্রেন চলাচল শুরু হয়। সরজমিনে দেখা গেছে, চানপুর বাজারের সকল দোকানপাট বন্ধ। সংঘর্ষের পর থেমে গেছে বাজারে মানুষের কোলাহল। গ্রামগুলোও পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। চানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। চানপুর তমিজ উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায় । কি পরিমাণ রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করা হয়েছে জানতে চাওয়া হলে এএসপি সদর সার্কেল সঞ্জয় সরকার বলেন, এখনো গণণা করা হয়নি। পুলিশ সুপার মুখলেছুর রহমান বলেন, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোঃ আবদুল মান্নান বলেন, কঠোর ভাবে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply