জাতীয় সংসদ টিভি চ্যানেল কেন প্রয়োজন?

(কুমিল্লাওয়েব ডট কম):
বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদের অধিবেশন সরাসরি সম্প্রচারের উদ্দেশ্যে ‘সংসদ টিভি চ্যানেল’ নামে একটি টিভি চ্যানেল চালু করার ঘোষনা দিয়েছে। সংসদের অধিবেশন যখন থাকবে না, তখন এই টিভি চ্যানেলটি শিামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করবে বলে জানা গেছে। তবে ‘সংসদ টিভি চ্যানেল’ এর পরিবর্তে ‘জাতীয় সংসদ টিভি চ্যানেল’ এবং সংক্ষেপে‘জাসটিভি’ নামকরণ করলে যথার্থ ও সার্থক হবে বলে মনে হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় সংসদ ও এর কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রয়াস তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলের বেশীরভাগ নেতা-কর্মী সরকারের আইনসভা ও এর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন না। জাতীয় সংসদ কীভাবে গঠিত হয়, এর মতা ও দায়িত্বাবলী কি, জাতীয় সংসদের কমিটিগুলো কিভাবে গঠিত ও পরিচালিত হয়, এর যাবতীয় ব্যয় কীভাবে নির্বাহ হয় ইত্যাদি সম্পর্কে বিশেষ ধারণা রাখা প্রত্যেক ভোটারের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তাই জাতীয় সংসদকে আরো কার্যকর করার লক্ষে এই চ্যানেলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু সরকারের এই উদ্যোগকে কেউ কেউ সমালোচনাও করছেন। তাদের মতে জাতীয় সংসদে ‘খুব বেশী অপ্রয়োজনীয়’ কথা হয়, তাই এ ধরনের কোনো টিভি চ্যানেলের আদৌ প্রয়োজন নেই।

রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক-ভৌগোলিক প্রতিষ্ঠান। অধ্যাপক গার্নারের মতে, চারটি উপাদান নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়, তা হলো, জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূ-খন্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব। এই চারটি উপাদানের মধ্যে সরকারের গুরুত্ব অপরিসীম। গণতান্ত্রিক সরকারের তিনটি বিভাগ থাকে, যথা- ১) বিধানিক বিভাগ; ২) নির্বাহিক বিভাগ; ও ৩) বিচারিক বিভাগ। সরকারের তিনটি বিভাগের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভারসাম্য বজায় রেখে প্রতিটি বিভাগ কতকগুলো সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করে থাকে। বিধানিক বিভাগ তথা আইনসভার প্রধান কাজ হলো: রাষ্ট্রের পলিসিগত বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, বিতর্ক ও আইন প্রণয়ন করা। এই বিভাগটিতে সরকারি দল, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সদস্যগণ যৌথ প্রচেষ্টায় কার্য নির্বাহ করে থাকেন। বিভিন্ন দেশের আইনসভাগুলো বিভিন্ন ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে। আইনসভার সদস্য সংখ্যা, সদস্যদের যোগ্যতা, কার্যকাল, নির্বাচনিক পদ্ধতি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম হয়। জাতীয় আইনসভা এক কবিশিষ্ট হতে পারে, আবার তা দ্বি-ক বিশিষ্টও হতে পারে। বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে বিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এক কবিশিষ্ট আইনসভা রয়েছে যা জাতীয় সংসদ নামে অভিহিত।

তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুধু জাতীয় বিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, স্থানীয় বিধানিক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে স্থানীয় বিধানিক প্রতিষ্ঠান নেই। বাংলাদেশে স্থানীয় বিধানিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক আবু তালেব তাঁর প্রণীত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় বিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনিয়ন সংসদ, নগর সংসদ, উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ ও বিভাগীয় সংসদ স্থাপনের জন্য সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক লোকাল গভার্ন্যান্স-সিডিএলজির প থেকে প্রস্তাবিত কাঠামো উপস্থাপন করেন। আমরা আশা করি সরকার এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।

১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত ও গৃহীত হয়। এই সংবিধানের অধীনে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর অব্যবহিত পরেই নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণের সমন্বয়ে এদেশে জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে নবম জাতীয় সংসদ কার্যকর রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও এই জাতীয় সংসদের কার্যাবলী সম্পর্কে মানুষ কতটুকু জানেন ও বোঝেন? জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে এত সংশয় ও সন্দেহ কেন? জাতীয় সংসদের সদস্যগণের মতা ও দায়িত্ব নিয়ে হরহামেশা বিতর্কই বা হয়ে আসছে কেন?

ভারত-বাংলাদেশে আইনসভার গঠন ও এর কার্যাবলী শুরু হয় বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। তাতে স্থানীয়দের ভোটাধিকার ও আসন সংখ্যা সীমিত ছিল। বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বর্তমানে আইনসভার বিষয়টি স্থিত হয়েছে ধরা যায়। এদেশের মানুষও আইনসভা ও সেটিকে কেন্দ্র করে রাজনীতি গ্রহণ করেছে বলে মনে হয়। এখন প্রয়োজন, আইনসভা ও আইনসভা কেন্দ্রিক রাজনীতিকে পরিপুষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করা। সেজন্য সরকার যদি ‘সংসদ টিভি চ্যানেল’ চালু করে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদকে শক্তিশালী করতে চায়, তাহলে প্রত্যেক গণতন্ত্রমনা ব্যক্তির উচিত হবে এ উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়া, এবং সেটিকে সফল করতে সহযোগিতা করা।

এ প্রসঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো আইনসভা বৃটিশ পার্লামেন্টের ভূমিকার কথা বলা যায়। খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে উৎপত্তি হয়ে এই আইনসভা আজ সে দেশের রাষ্ট্রীয় জীবনের সবচেয়ে সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অথচ পূর্বে এখানেও বহুবার অশালীন তর্কবিতর্ক, মারামারি ইত্যাদি দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। তাই বলে সেখানকার জনগণ পার্লামেন্টের গুরুত্ব ভুলে যাননি; বরং সেটিকে কেন্দ্র করেই তারা সকল রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসা করে আসছেন। বস্তুতঃ এভাবেই গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক সহনশীলতার বৃটিশ ঐতিহ্য। অনেক রাষ্ট্রই রাজনৈতিক সহনশীলতার জন্য এ ধরনের ঐতিহ্য সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে।

অনুরূপভাবে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ও এর কার্যাবলী সম্পর্কে জনমনে ব্যাপক ধারণা তৈরি করে বিরোধ মীমাংসার অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। সেজন্য ‘জাতীয় সংসদ টিভি চ্যানেল’ চালু করে জাতীয় সংসদের অধিবেশন, বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির বৈঠক, নানা রকম বিবৃতি প্রকাশ এবং এসবের প্রেক্ষিতে জনমত ইত্যাদি সম্প্রচার করা একান্ত প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, সেখানে বিভিন্ন দেশের আইনসভার ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরে সরকারের বিবর্তন ধারায় আইনসভার গুরুত্বের বিষয়গুলো তুলে ধরাও হবে অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ। ফলত, এসব বিষয় জেনে বুঝে এদেশের স্থানীয় জনসাধারণ তাদের স্ব স্ব স্থানীয় ইউনিট/সরকারের জন্যও স্থানীয় সংসদ চালু করার প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে উপলব্ধি করবেন। তাই, সেরকম ব্যবস্থা গৃহীত হলে প্রস্তাবিত চ্যানেলটির দর্শকপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে বৃিদ্ধ পেতে থাকবে বলে আশা করা যায়।

লেখকবৃন্দ: প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, ডিরেক্টর ইন-চার্জ, জাপান স্টাডি সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ড. এ.কে.এম রিয়াজুল হাসান, সহযোগী অধ্যাপক, বিসিএস (শিক্ষা) এবং মোশাররফ হোসেন মুসা, সদস্য, সিডিএলজি।

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...