কুমিল্লায় ছেলেধরা সন্দেহে ভন্ডপীরের গাড়িতে হামলায় নিহত ১ ॥ পীরসহ আহত ৭

এমএ হোসেন,২২জুলাই (কুমিল্লাওয়েব ডট কম)
কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে ক্ষুদ্ধ জনতার গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হয়েছে দেবিদ্বার উপজেলার ইউসুফপুর গ্রামের ভন্ডপীর আবদুল মতিন ও তার ৭ সহযোগি। হাসপাতালে নেয়ার পর গণপিটুনির শিকার ওই পীরের ভক্ত আব্দুল হাই মামুন নামের এক যুবক নিহত হয়েছে। আহতদের আশংকাজনক অবস্থায় কুমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ওই ভন্ডপীরের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় কুমিল্লার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বেলা ১১টায় এ ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, আমেরিকা প্রবাসী এক গৃহবধূকে ধর্ষণ ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে দেবিদ্বার থানায় দায়েরকৃত মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে এসে বাড়ি ফেরার পথে শাসনগাছা এলাকায় ১০/১৫ জনের একটি দল তাদেরকে অনুসরণ করে শাসনগাছা বাসষ্ট্যান্ডে এসে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘এই মাইক্রোতে ৮/৯ জন ছেলেধরা রয়েছে’। এ সময় বাসষ্ট্যান্ডের জনতা মাইক্রোবাসটি আটক করে তাদেরকে গণপিটুনি দেয়। এতে ভন্ডপীর আবদুল মতিন (৫৫), ভক্ত আব্দুল হাই মামুন (২৭), জাকির (২৪), মনির (৩০), ইউসুফ আলী (৩২), রহিম (৪৫), আবু মুছা (৩৫) ও মিজানুর রহমান (৩৮) গুরুতর আহত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ক্ষুব্ধ জনতার কবল থেকে আহতদের উদ্ধার করে কুমেক হাসপাতালে নিয়ে যায়। আহতদের মধ্যে ভন্ডপীরের ভক্ত আব্দুল হাই মামুনকে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত বলে ঘোষণা করেন। নিহত ওই ভক্ত জেলার মুরাদনগর উপজেলার বাইরা গ্রামের আবদুল আজিজের পুত্র। আহত অন্যদের অবস্থা আশংকাজনক। হাসপাতালে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ সুপার মোহাঃ শফিকুল ইসলাম জানান, তাদেরকে ছেলেধরা সন্দেহে জনতা পিটিয়েছে, ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোন কারণ রয়েছে কিনা তা’ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার ইউছুফপুর গ্রামে আবদুল মতিন নামের এক ভন্ডপীর আমেরিকা প্রবাসী এক মহিলাকে ‘নুরের সন্তান’ জন্ম দেবার প্রলোভনে পীরের গোপন আস্তানায় অবৈধ মেলামেশা করাসহ প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে গত ২৪ মে দেবিদ্বার থানায় মামলা দায়ের করার পর আস্তানা ছেড়ে পালিয়েছে ভন্ড পীর ও তার সহযোগীরা। গত শুক্রবার ওই এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে এলাকাবাসীর সাথে আলাপকালে ওই ভন্ড পীরের নানা অপকর্ম বেড়িয়ে এসেছে। দীর্ঘ প্রায় ২যুগ যাবৎ ওই ভন্ডপীর তার আস্তানায় অসংখ্য মহিলাকে নূরের সন্তান জন্ম দেবার প্রলোভনে অবৈধ মেলামেশা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান আবদুল মতিন (৫৮) প্রায় ২ যুগ যাবৎ এলাকায় নিজকে পীর দাবী করে প্রতারনা করে অর্থ লোপাট করে কোটিপতি হয়েছেন। নানা প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ভক্তদের নিকট থেকে লুটে নিয়েছেন বিপূল পরিমান অর্থ। ইউছুফপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ব্যয় বহুল আস্তানা। ওই আস্তানার গোপন কইক্ষে দিবা রাত্রি চলতো ওই ভন্ডপীরের অনৈতিক যতো কর্মকান্ড। সর্বশেষ এক আমেরিকা প্রবাসীর স্ত্রীর সাথে অবৈধভাবে মেলামেশা করে তাকে অন্তস্বত্বা করার পরই ওই ভন্ড পীরের সকল অপকর্ম এলাকায় ফাঁস হয়ে যায়। গত ২৪ মে একই গ্রামের আমেরিকা প্রবাসী আলমগীর আবদুল মান্নান (৫০) বাদী হয়ে দেবিদ্বার থানায় ওই ভন্ডপীরের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায় তিনি (মামলার বাদী) ও তার স্ত্রী পারভীন আক্তার (৩৮) কে নানা প্রলোভনে ওই ভন্ডপীর তার নিকট মুরিদ হতে বাধ্য করে। গত ১০ এপ্রিল ওই আমেরিকা প্রবাসীর স্ত্রী পারভীন আক্তার দেশে এসে পর দিন ওই ভন্ডপীরের আস্তানায় তার সাথে দেখা করতে গেলে তাকে বেহেস্তের টিকেট পেতে হলে ৬ লাখ টাকা দাবী করে। ভন্ডপীরের প্ররোচনায় ১৭ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ভন্ড পীরের আস্তানায় ওই মহিলাকে রেখে তার সাথে অবৈধ মেলামেশা করতে বাধ্য করা হয়। এসময় ওই পীর সুকৌশলে ওই মহিলার নিকট থেকে ৫ লাখ ৫২ হাজার টাকাও হাতিয়ে নেয়। ২৭ এপ্রিল সে আমেরিকায় ফিরে গিয়ে নুরের সন্তান জন্ম লাভের আশায় ওই ভন্ড পীর তার সাথে ৫ দিন- ৫রাত অবৈধ মেলামেশা ও অন্তস্বত্বা হওয়ার বিষয়টি স্বামীর নিকট প্রকাশ করে। প্রতারনার শিকার ওই মহিলার স্বামী আলমগীর গত ১৯ মে বাংলাদেশে আসার পর ওই ভন্ডপীরের মুখোশ উন্মোচিত করে ফেলায় এ নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ভন্ড পীরের বিচারের দাবীতে এনিয়ে ইতিমধ্যে এলাকায় বিক্ষোভ, সমাবেশ, প্রতিবাদ সভা ও পোষ্টারিং করা হয়েছে। থানায় দায়েরকৃত মামলায় আরো অভিযোগ করা হয় ভন্ড পীর ওই প্রবাসী ও তার স্ত্রীর নিকট থেকে বিভিন্ন সময় প্রতারনার আশ্রয়ে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ১৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়াও ওই পীর তার নিকট আসা মহিলাদেরকে নুরের সন্তান জন্ম দেবার প্রলোভন দেখিয়ে গোপন আস্তানার একটি সংরতি কে এনে অবৈধ মেলামেশা করেছেন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। এদিকে, ওই ভন্ডপীরের বিচারের দাবিতে গত ২৬ জুন শহরতলীর একটি হোটেলের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত সমাবেশে দেশের শীর্ষ স্থানীয় পীর-মাশায়েখসহ জাতীয় ও স্থানীয় আলেম-ওলামাগণ উপস্থিত ছিলে। ওই সমাবেশে আবদুল মতিনকে মিথ্যা নবুয়ত দাবীদার, প্রতারক, নারী লোভী, ইসলামদ্রোহী আখ্যায়িত করে অবিলম্বে তাকে গ্রেফতারসহ ফাঁসির দাবি জানানো হয়।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...