আজ বৃহস্পতিবার নতুন বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী


ঢাকা, জুন ১০ (কুমিল্লাওয়েব ডট কম) :
আকার এক লাখ ৩২ হাজার ২০০ কোটি টাকা
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৯৩ হাজার কোটি টাকা
সামগ্রিক ঘাটতি ৩৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী অর্থবছরের (২০১০-১১) জাতীয় বাজেট আজ বৃহস্পতিবার ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রী নতুন বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি করের বোঝা না চাপানোর আশ্বাস দিয়েছেন।নতুন বাজেটের আকার হবে এক লাখ ৩২ হাজার ২০০ কোটি টাকার কিছু কম বা বেশি। সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৯২ হাজার ৮৪৭ কোটি ২৬ লাখ ১৬ হাজার টাকা। সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ৩৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। কৃষি খাতে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকিসহ মোট ভর্তুকির পরিমাণ ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। নতুন বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (জিডিপি প্রবৃদ্ধি) হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ধরা হবে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।এটি হবে দেশের ৩৯তম বাজেট। আর দুই দফায় আবুল মাল আবদুল মুহিতের চতুর্থ বাজেট। জাতীয় সংসদে বিকেল চারটায় শুরু হবে ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন বাজেটের প্রধান ফোকাস হবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। কেননা, দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে এ দুই খাতের উন্নয়ন ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে যত সমালোচনা হয় আর কিছু নিয়ে অতটা সমালোচনা হয় না। আর তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে নতুন বাজেটের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আমরা বিবেচনা করছি।’
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় বাড়াতে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্যাপিটাল গেইনের (মূলধন মুনাফা) ওপর কোনো কর আরোপ করা হচ্ছে না। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ এবং কম্পানির পরিচালকদের পাঁচ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। এ ছাড়া ফ্ল্যাট ও জমি বিক্রি করে মুনাফা করলে অর্থাৎ লাভ হলে মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে ‘ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স’ দিতে হবে। যতবার হাতবদল হবে ততবারই মুনাফার ওপর ওই কর দিতে হবে। প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে গাড়ি, এলসিডি টিভিসহ সব ধরনের বিলাসী পণ্যের আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আদায় বাড়াতে এর আওতা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের কথা থাকবে। আর করমুক্ত আয়ের সীমা আগের মতো এক লাখ ৬৫ হাজারই থাকছে।
চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেট ছিল এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার। ব্যয়ের মধ্যে এডিপির সাড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা। আর আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৪ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। নতুন বাজেট হতে পারে এক লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকার। এর মধ্যে উন্নয়ন বাজেট সাড়ে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ৯৩ হাজার ৬৮০ কোটি টাকার মতো। এর ফলে বাজেট ঘাটতি হবে ৩৯ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি।
ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধরা হচ্ছে বেতন-ভাতা ও সুদ পরিশোধে। আগামী অর্থবছরে ঘোষিত বেতনকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় সুদ পরিশোধ খাতেও ব্যয় বাড়বে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতের বরাদ্দও বাড়ছে। বিদ্যুৎ-সংকট সমাধানে ভাড়াভিত্তিক ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ কেনা হবে। এ জন্য দুই হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ ভর্তুকি দিতে হবে। তবে এই অর্থ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হবে বলে জানা গেছে।
অর্থমন্ত্রী চলতি বাজেটকে বলেছিলেন কিছুটা সম্প্রসারণমুখী। আগামী অর্থবছরের বাজেট হবে আরও সম্প্রসারণমুখী। মূলত বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়েই এই পথে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রীর আশা, এর ফলে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার ২৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। কয়েক বছর ধরে এটি ২৪ শতাংশের মধ্যে রয়ে গেছে। এ থেকে উত্তরণ ঘটানো যায়নি। নতুন অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এটি হবে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ।তবে এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৭ শতাংশ রাখা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জন্যও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ছিল সাড়ে ৬ শতাংশ। তবে শেষ পর্যন্ত তা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ঘটবে আরও প্রায় ৭ শতাংশ। সুতরাং ভোক্তাদের জন্য বড় কোনো আশাবাদ আনছে না নতুন বাজেট।
নতুন বাজেটে শুধু বরাদ্দ না বাড়িয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাজেটের আকার এক লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। ইতিমধ্যে ৩৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হবে ৯৩ হাজার কোটি টাকার মতো। সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ৩৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি, যা জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ঘাটতি পূরণের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার মতো ঋণ নেওয়া হবে। বাকি সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে সংস্থান করা হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যে ঋণ নেওয়া হবে তার মধ্যে ১৬ হাজার কোটি টাকার মতো নেওয়া হবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে (ট্রেজারি বিল ও বন্ড) এবং ব্যাংক বহির্ভূত উৎস (জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প) থেকে ধার নেওয়া হবে আট হাজার কোটি টাকার কিছু কম বা বেশি।নতুন এডিপিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ছয় হাজার ৭৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা (মোট এডিপির ১৬ শতাংশ), যা চলতি অর্থবছরের বরাদ্দের চেয়ে এক হাজার ৭৯৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বেশি। চলতি এডিপিতে এ খাতে চার হাজার ২৭৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে।
সংবিধানের ২০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।’ আবার নির্বাচনী ইশতেহারেও আওয়ামী লীগ বলেছে, ‘রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালো টাকা এবং পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’তার পরও চলতি বাজেটে অর্থমন্ত্রী কালো টাকা সাদা করার ব্যাপক সুবিধা দিয়েছিলেন। বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে এই সুযোগ দেওয়াকে রাজনৈতিক আপস বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন। যদিও এই সুযোগ খুব একটা নেননি ব্যবসায়ীরা। তার পরও সীমিত আকারে হলেও আবারও একই ধরনের সুবিধা থাকছে নতুন বাজেটে।
নতুন দুটি কর: দেশে প্রথমবারের মতো নতুন দুই ধরনের করব্যবস্থা চালু হতে পারে। এর মধ্যে মূলধনি লাভ কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) মূলত শেয়ারবাজারের জন্য। পুঁজিবাজার থেকে লাভবান হলে এই কর দিতে হবে। তবে প্রথমবারের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে এই কর আরোপ করা হবে না। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এটি চালু হচ্ছে। এর বাইরে শেয়ারবাজারে লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্রোকারেজ হাউসকে ভ্যাটের আওতায় আনা হচ্ছে। এ ছাড়া এসব ব্রোকারেজ হাউসের পরিচালকদেরও মূলধনি লাভের ওপর কর দিতে হবে।নতুন করে চালু অন্য করটি হচ্ছে উত্তরাধিকার সম্পত্তি কর। উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পেলে এর বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে কর দিতে হবে। তবে এটি শুধু শহর এলাকায় চালু থাকবে বলে জানা গেছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, বাজেট ঘোষণার দিনই সম্পূরক আর্থিক বিবৃতি, মঞ্জুরি ও বরাদ্দের দাবিগুলো (উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন), মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, সংযুক্ত তহবিলপ্রাপ্তি, বাজেটের সংক্ষিপ্তসার, বাজেট বক্তব্য, বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি, অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১০, জেলা বাজেট ও একীভূত বাজেটের একটি ধারণাপত্র ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
বাজেটে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইট -এ সব তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রকাশ করা হবে। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফিডব্যাক ফরম পূরণ করে বাজেট সম্পর্কে মতামত ও সুপারিশ দিতে পারবেন যে কেউ।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...