সাক্ষাতকার : আল মাহমুদ

Al Mahumd
কবি আল মাহমুদ
পান্থ বিহোস : সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সাম্প্রতিক লিটলম্যাগগুলোর কার্যক্রম এবং প্রভাব সম্পর্কে বলুন।
আল মাহমুদ : আমি অবশ্য সব লিটলম্যাগ সংগ্রহ করতে পারি না। তবে কয়েকটা আমি নিজে গিয়ে সংগ্রহ করে আনি আজিজ মার্কেট কিংবা বিভিন্ন জায়গা থেকে। ওখানে তরুণ লেখকদের একটা পরিচয় গোষ্ঠীবদ্ধ পরিচয়, গোষ্ঠীবিহীন পরিচয় পাওয়া যায়। আমি খুব বিস্মিত হই যে, লিটলম্যাগুলোই প্রকৃত সাহিত্য করছে। বড় পত্রিকাগুলোতো সাহিত্যের চেয়ে পপাতিত্বই করে বেশি। লিটলম্যাগেও আছে কিন্তু আমার কথা হলো যে, এদেশে যেহেতু কোনো সাহিত্য পত্রিকা নেই- প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য পত্রিকা যেহেতু নেই একারণে লিটলম্যাগগুলোর ভূমিকা খুব বড়। আমরা লেখক কোথা থেকে খুঁজে বের করবো? লিটলম্যাগ থেকেই খুঁজে বের করতে হবে। এটা হলো আমার কথা।
পান্থ বিহোস : সাহিত্যে দশক বিভাজন দশকীয় সাহিত্যিকদের জন্য কতোটা উপকারী?
আল মাহমুদ : কোনো উপকার আনে না। তবে দশক বিভাজন অনেক সময় শক্তিও জোগায়। যেমন আমি পঞ্চাশের দশকের লেখক। আমার সাথে যখন পঞ্চাশ দশকের লেখকের একটা গোষ্ঠীবদ্ধতা ছিলো তখন আমাদের কোনো খ্যাতি ছিলো না, প্রতিপত্তি ছিলো না। তখন আমরা বলেছি পঞ্চাশ দশকের লেখক। আমি, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী। কিন্তু যখন আমাদের একটু খ্যাতি, প্রতিপত্তি হলো তখনই দশক ভেঙ্গে গেলো। ভেঙ্গে গিয়ে এক একটা বই বেরিয়ে এলো। যেমন- আমার সোনালি কাবিন, শামসুর রাহমান-এর প্রথম রাত দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে বা রোদ্র রোদ্র করোটিতে, শহীদ কাদরীর উত্তরাধিকার। তখন বইয়ের পরিচয়ে পরিচিত হতো। তো এটা দশক- অবশ্য সাহিত্যের জন্য দশকটা কোনো ব্যাপার না। কারন তোমার যদি ভালো একটা কবিতা হয়, তুমি কোন দশকের সেটা কেউ প্রশ্ন করে না। তাই না? একটা ভালো গল্প লেখলে সেটা সব দশকেই চলতে থাকে। তো আমি মনে করি যে, দশক মন্দও নয় আবার দশক প্রকৃত সাহিত্যের কোনো উপকারও করে না। হ্যাঁ, একটা ভালো রচনা কোন দশকে লেখা হয়েছে সেটা কি আমরা খুঁজি? খুঁজি না। আমরা জানতে চাইনা যে, কোন বড় কবি কোন দশকে জন্মেছে। এটা আসছে না।
পান্থ বিহোস : শাহবাগ, বাংলাবাজার, মগবাজার নিয়ে যে দলাদলি হচ্ছে তা ভবিষ্যত সাহিত্য পরিমণ্ডলের জন্য কতটুকু শুভ?
আল মাহমুদ : আমি অবশ্য দলাদলির পপাতি নই। এগুলো তো অন্যেরা করে- প্রকৃত লেখক দলাদলি করে না। কম প্রতিভাবান কবিই আছেন দলাদলি করেন। যেমন আমার সাথে শামসুর রাহমান-এর বিরোধ বাধিয়ে রেখেছিলো দীর্ঘ ত্রিশ বছর। হ্যাঁ, প্রায় ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আমাদের দেখা-সাাত হতো না। কিন্তু এখন তিনিও সেটা বুঝতে পেরেছেন তাই আমার বাসায় এসছেন, আমিও সেটা বুঝতে পেরেছি এবং তার বাসায় গেছি। এখন তো আমরা দুজনেই সত্তর বছর বয়স পার করেছি। ওনারতো আরও বেশি- আমার চেয়ে ছয় বছরের বড় তিনি। এখন দলাদলিটা কিসের? একজন সাহিত্যিকের মতান্তর থাকতেই পারে, তার দর্শন থাকতে পারে, তার বিশ্বাস-অবিশ্বাস থাকতে পারে। সেই জন্য মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যাবে সেটা তো হতে পারে না।
পান্থ বিহোস : তসলিমা নাসরিনের লেখায় নারী স্বাধীনতা কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে?
আল মাহমুদ : প্রথম কথা, আমি তসলিমা নাসরিনের লেখা অতো মনোযোগ দিয়ে পড়িনি। কারণ আমি জানি যে, সে ধর্মের বিরুদ্ধে, ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলে। অন্যায়ভাবে বলে, অপরিশীলিতভাবে বলে। সে ভালো করে ইসলাম পাঠ করে নাই, আমার দৃঢ় ধারনা। এটাও সত্য নয় যে, সে সবটা দায়ী। আমাদের দেশের প্রগতিবাদী কিছু লেখক তাকে প্রথমে ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়, ফলে সে দেশও ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তারপর সারা দুনিয়ায় কি করেছে তোমরা তো তা জানোই। তো তার প্রতি আমার একটা ইয়ে আছে যে, একসময় সে ভালো কবিতা লিখতো। কবিতাটা খুব ভালো লিখতো এবং আমরা ধারনা ছিলো সে কবিতাই লিখবে। যখন রুদ্রের সাথে তার বিয়ে হয় তখন আমি এটাই আশা করেছিলাম যে, সে কবি হিসেবে খ্যাতি পাবে। তারপর সে নানারকম বইটই লিখে- যেগুলোর প্রকৃত সূত্র নাই। তো তার সম্বন্ধে এইটুকু মন্তব্য আমার- সে হলো একজন হতভাগিনী-প্রতিভাময়ী লেখিকা।
পান্থ বিহোস : একজন কবি হিসেবে আপনার অবস্থান ব্যাখ্যা করুন।
আল মাহমুদ : এটা তো আমি নির্ধারণ করতে পারবো না ভাই। কারণ আমার সমসাময়িক কবিরা রয়েছেন- আমার মৃত্যুর আগে এটা নির্ধারিত হোক এটা অন্তত তারা চাননা। আমি অবশ্য লিখে যাচ্ছি, এই বলতে পারি।
পান্থ বিহোস : আধুনিক গদ্য কবিতার গতি প্রকৃতি ও আঙ্গিক কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে এবং কোথায় যাবে বলে আপনার ধারণা?
আল মাহমুদ : আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে লিরিক পছন্দ করি, মিলের কবিতা পছন্দ করি। বহমান ছন্দ-পয়ারের কবিতা পছন্দ করি। কিন্তু আমি নিজেও অনেক গদ্য কবিতা লিখেছি। এবং গদ্য কবিতার ভবিষ্যত কি এটা বলা মুশকিল। কারণ সমরসেন যে রকম গদ্য কবিতা লিখেছেন আমি তো সেরকম লিখিনি। আবার রবীন্দ্রনাথ তার মৃত্যুর আগে একটা লিখেছেন, ‘জন্ম দিনে’। সে বইটা গদ্য কবিতার। একদম প্যিউর গদ্য। তো এটা তিনি শেষ বয়সে এসে লিখলেন কেনা? তিনি নিশ্চয়ই শুধু ছন্দে থাকতে চাননি। আমার কথা হলো যে, গদ্য কবিতার ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন নয়Ñ কবিতার ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন। আমিতো য়ুরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন কবি সভাগুলোতে যাই। আমার যেটা কানে লেগেছে সেটা হলো, কবিতা হলো মূলত ভিন্ন ভাষায়- সাধারণ জনগোষ্ঠী যে ভাষা ব্যবহার করে কবিরা তারচে একটা ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করে। তবে যেটা লিরিকেল হয় সেটাই মধুরতর বলে আমি মনে করি। আমি গদ্য কবিতা লিখেছি তবে আর লিখছি না। আমার একটা বইও বেরিয়েছে। বইটার নাম হলো- না কোন শূন্যতা মানিনা। এ পর্যন্তই আমার গদ্য কবিতার অবস্থান হোক এটাই আমি চাই। আমি আবার ব্যাক করছি ছন্দে এবং ছন্দে এখন লিখছি, পয়ারে লিখছি, মাত্রাবৃত্তে যেতে চেষ্টা করছি। একজন কবি নানা ঢঙে কাজ করে তার কবি প্রতিভার পরিচয় দেয়, গদ্য-পদ্য এটা কোনো ব্যাপার নয়।
পান্থ বিহোস : স্বাধীনতা যুদ্ধকালে আপনার অবস্থান বর্ণনা করুন।
আল মাহমুদ : আমি একজন স্বাধীনতাযোদ্ধা। এর বেশি আর কি বলবো?
পান্থ বিহোস : বাস্তব জীবনে যে যৌনতা সেটা সাহিত্যে আসলে যারা বিরুপ দৃষ্টিতে দেখেন তাদের সম্পর্কে মন্তব্য করুন।
আল মাহমুদ : এটা আমার পে বলা একটু মুশকিল। কারণ আমার সাহিত্য সম্বন্ধেও তো এই অভিযোগ উঠেছে। এখন কথা হলো যে, সাহিত্যের সত্য বহমান অবস্থা, সমাজে কি ঘটছে তার একটা চিত্র সাহিত্যে থাকতেই হবে। সেটা করতে গেলে কিছু যৌনাচারের কথাও বলতে হয়। আচার-আচরণে মানুষ কেমন, তোমার দেশে এখন, এই দেশেÑ তুমি তো শুধু ঢাকায় থাকো-
পান্থ বিহোস : মঈন ভাই ঢাকার। আমি কিন্তু ঢাকার বাইরের। আমার বাড়ি আপনার বাড়ির পাশেই- দেবিদ্বার।
আল মাহমুদ : তাই! হলে কি হবে? তুমি দেবিদ্বার সম্পর্কে জানো? জানো না। যাই হোক, আমি ঢাকার বাইরেও যাই, সারা দেশটা আমি ঘুরি। মানুষের যৌন আচরণটা কেমন সেটা আমি পরখ করি, কারণ আমাকে লিখতে হয়। তো আমি নিজে অবশ্য অশ্লীলতার পপাতি নই। কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করার তো কোনো উপায় নাই। তবে আমি মনে করি যে, সাহিত্যিকদের অনেক ব্যাপারই মার চোখে দেখতে হবে। কারণ সাহিত্যিকরা সামাজিক সত্য উচ্চারণ করেন।
পান্থ বিহোস : সামগ্রিকা প্রোপটে সরকারের প হতে বাংলাদেশের লেখকদের মূল্যায়ন করা হয় কি?
আল মাহমুদ : এটাতো আমাকে প্রশ্ন করা উচিত নয়। কারণ আমি সরকারের কেউ নই। আমি ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু জানি যে, কোনো সরকারই লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে চায় না। লেখকরা যদি সঙ্ঘবদ্ধ থাকেন তো কোনো কোনো বিষয়ে হয়তো পৃষ্ঠপোষকতা হয়। তবে আমাদের দেশে অনেক পুরস্কার আছে যেগুলো সরকার থেকেই অর্থ আসে। যেমন- বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক এগুলো আর কি।
পান্থ বিহোস : পুরস্কার ছাড়া কি আর কোনো…
আল মাহমুদ : আর কি পৃষ্ঠপোষকতা সরকার দেবে এটা বিশ্লেষণ না করে তো বোঝা যাবে না। আমরা আসলে সরকারের কাছ থেকে চাই কি সেটা দেখতে হবে। যেমন আমি ব্যক্তিগতভাবে- সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপারটা ওঠলে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করি না।
পান্থ বিহোস : আপনি কি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা চাননা?
আল মাহমুদ : হ্যাঁ, চাই। তবে প্রচুর বই কিনুক সেটা চাই, তারা সাবসিডি দিক সেটা চাই, একজন তরুণ লেখকের বই বের হলে অন্তত দু’হাজার কপি কিনে নিক, সেটা চাই- এভাবে তারা পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারে। কিন্তু আমি তো ভিা চাই না, আমি কি ভিুক? অ্যাম আই এ ব্যাগার? আমি ভিুক নই- লেখক আমি। আমার একটা অহঙ্কার থাকবে না?
পান্থ বিহোস : মানে বলতে চাচ্ছেন সরকার স্বইচ্ছায় করুক?
আল মাহমুদ : হ্যাঁ। সরকার সহযোগিতা করতে পারে, খোঁজ-খবর নিতে পারে লেখকদের, পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারে। তবে পদ্ধতিটা কি হবে সেটা সরকার ঠিক করবে, এটাতো লেখক ঠিক করবে না।
পান্থ বিহোস : সাহিত্যের েেত্র ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া কতটুকু ভূমিকা রাখছে? কতটুকু রাখা উচিত?
আল মাহমুদ : সাহিত্য হলো ব্যক্তি চিন্তার ফসল। ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া সাহিত্যকে সাহায্য করবে এটাই তো আমরা চাই। তো আমাদের মৌলিক সাহিত্য কিন্তু ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় যাচ্ছে না। ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া সস্তা জিনিস নিয়ে যাচ্ছে। নাটক, এটা-সেটা, স্কৃপ্ট-টৃপ্ট লেখা এগুলো আর কি। কিন্তু একটি ভালো উপন্যাসকে ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া এখনো সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি। যদিও তারা চেষ্টা করছে। আমি ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার বিরুদ্ধে নই, তাদের প।ে তাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। প্রতিভাবান সবাই আসলে, হয়তো তারা আরও ভালো কাজ করবে।
পান্থ বিহোস : কবি-লেখকদের নিয়ে কি মিডিয়া কোনো অনুষ্ঠান করতে পারে না?
আল মাহমুদ : করছে তো সবসময়। অবশ্য কবি-লেখকদের নিয়ে যা করছে এতে কি আমরা পরিতুষ্ট? সেখানে আমাদের মতো লেখকদের নিচ্ছে, তরুণদেরতো ডাকছে না। একজন তরুণ লেখককে নিয়ে তো তারা বিশ মিনিটের একটা অনুষ্ঠান করেন না। এটা সরকারী মিডিয়াকে বললে হবে না, সব মিডিয়াগুলোই। একজন তরুণ কবিকে পরিচয় করিয়ে দেয়া, দেশবাসীর কাছে, তার একটা বই বের হয়েছে সে ধরণের কথা নিয়ে কিন্তু কেউ অনুষ্ঠান করছে না। আধঘন্টা কিংবা পনের মিনিটের অনুষ্ঠান কি করতে পারে না?
পান্থ বিহোস : হ্যাঁ, হ্যাঁ সেরকম অনুষ্ঠানের কথাই বলছিলাম-
আল মাহমুদ : আমি কিন্তু বিটিভিতে কথামেলা নামক একটা অনুষ্ঠান করি। এখানে কবি-লেখকরা আসে। তবে আমি তো সিলেক্ট করি না কে কে এখানে আসবে। অনুষ্ঠান যারা করে তারাই ঠিক করে দেয়। আমি শুধু তাদের সাথে আলাপ করি, দেশবাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিই।

Check Also

যুদ্ধে যুদ্ধে জীবনঃ মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার জাহিদের এক সংগ্রামী জীবনালেখ্য

কানাডা প্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠক দেলোয়ার জাহিদের জীবন জীবিকা ও দেশ ...