ভারতের বিমান দূর্ঘটনায় বেচেঁ যাওয়া ৮ সৌভাগ্যবানের মধ্যে একজন বাংলাদেশী!

ভারতের কর্নাটক রাজ্যের ম্যাঙ্গালোরের বাজপে বিমানবন্দরে গত শনিবার এয়ার ইন্ডিয়ার দুবাই ফেরত একটি ফ্লাইট অবতরণকালে বিধ্বস্ত হয়ে ১৫৮ জন যাত্রী প্রাণ হারালেও অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন ৮ জন। এই আটজন সৌভাগ্যবানের একজন ছিলেন বাংলাদেশী তরুণী সাবরিনা হক নাসরিন (২২)। তাকে ম্যাঙ্গালোরের এ. জে. হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। সাবরিনার মা-বাবা দুবাইতে বাস করেন। গতকাল ম্যাঙ্গালোর যাবার জন্য ভিসার আবেদন করলে সংযুক্ত আরব আমীরাতের ভারতীয় দূতাবাস দ্রুততার সঙ্গে তাদের ভ্রমণ ভিসা দিয়ে দেয়। দূতাবাসের কর্মকর্তা এম কে লোকেশ জানান, সাবরিনার মা-বাবা ভিসার জন্য আবেদন করলে দ্রুত তা মঞ্জুর হয়েছে। বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের স্বজনদের সুবিধার্থে গতকাল দুবাইয়ের ভারতীয় দূতাবাস মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা ছিল। এদিকে, দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটি থেকে ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করা হয়েছে। এখন দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে বলে বিমান কর্তৃপক্ষ মনে করছে।
রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে এক সময় থেমে যায় বিমান। তখন সিট বেল্ট খুলে ফেলি। চেষ্টা করি উঠে দাঁড়াতে। তখন মনে হয় পা যেন আটকে গেছে! ম্যাঙ্গালোরে শনিবার বিধ্বস্ত এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান থেকে অলৌকিক ভাবে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশী যাত্রী সাবরিনা এভাবেই বর্ণনা করেন তার সংজ্ঞা হারানোর আগের মুহূর্তটিকে। বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার পূর্ব মুহূর্তের কথা মনে পড়লে এখনও যেন শিউরে ওঠেন তিনি। বলেন, শেষে গতি না কমিয়েই বিমানটি স্পর্শ করলো রানওয়ে।
টের পেলাম। গতি তবু কমলো না। বরং বাড়লো। আমার মন বললো, কিছু একটা হচ্ছে। সাবরিনা বলেন, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কয়েক মিনিট আগে ঘুম ভেঙেছিল। হয়তো তাই বেঁচে ফিরেছি। বাবা-মা’র দোয়া। প্রথমবারের মতো হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সাবরিনা। সেটা এখন বড় কিছু নয়। অলৌকিকভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। দুবাইতে বাবা-মাকে ছেড়ে রওনা দিয়েছিলেন। ম্যাঙ্গালোরের কস্তুরবা মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নশিপ শেষ করতে যাওয়া। সেখানে জীবন যে এত বড় বিস্ময় নিয়ে অপেৰা করছিল, তা কে জানতো। সাবরিনা নাসরিন হকের জন্ম ঢাকায়। চিকিৎসক পিতার চাকরির সুবাদে দুবাইয়ে বড় হয়েছেন তিনি। এখন সাবরিনা মোটামুটি সুস্থ। মা রোকেয়া খাতুন পৌঁছেছেন ম্যাঙ্গালোরে। তার বাম পা ভেঙেছে। মাথা, হাত আর পায়ের অনেক জায়গা কেটে গেছে। এজে হাসপাতাল কর্তৃপৰ জানিয়েছে, তাকে আইসিইউতে নিবিড় পর্যবেৰণে রাখা হয়েছে। তার চেতনা আছে। তবে এত বড় দুর্ঘটনার কবল থেকে ফিরে আসার মানসিক ধকল রয়েছে। তাকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে বলা হয়েছে। তবু এজে হাসপাতালে সাবরিনাকে নিয়ে সকলের কৌতূহলের শেষ নেই। ভারতীয় মিডিয়া তো বটেই, বাংলাদেশ থেকে অজস্র ফোন যাচ্ছে তার কাছে। আত্মীয় পরিজন, শুভাকাঙ্ক্ষীদের ফোনে জেরবার এজে হাসপাতালের কর্মীরা। অনেক জোরাজুরির পর তাদের কাছ থেকে মিললো সাবরিনার ফোন নম্বর। তবে সাবরিনার কথা বলা বারণ-জানিয়ে দেন দায়িত্বে থাকা ডাক্তার। পরে ওই ফোন নম্বরেই কথা হয় সাবরিনার মা রোকেয়া খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাবরিনার অবস্থা স্থিতিশীল। দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, ও যেন পুরো সুস্থ হয়, সবার কাছে সে দোয়াই চাই। তার চিকিৎসা ও দেখভালে ভারত সরকার, এয়ার ইন্ডিয়া ও হাসপাতাল কর্তৃপৰ কোন ঘাটতি রাখেনি। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার খবর জানার পর আবু ধাবিতে ভারতীয় দূতাবাস বন্ধের দিনেও আমার ভিসা দিয়েছে। টিকিটের ব্যবস্থা করেছে। আমি আল শাইন থেকে শনিবার রাত আটটায় ম্যাঙ্গালোরের উদ্দেশে রওনা দেই। রাত ১২টার দিকে পৌঁছানোর পর এয়ার ইন্ডিয়া গাড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে এবং মেয়ের সঙ্গে দেখা করিয়েছে। তারপরই আমার স্বস্তি মিলেছে।
সাবরিনার সিট ছিল ৭বি। এয়ার ইন্ডিয়ার এক্সপ্রেস ফ্লাইট ৮১২ সামনের দিকেই ছিল সে সিট। পেৱনটি দ্র্বত যেভাবে রানওয়ে ছোঁয়, তেমনি দ্র্বতই রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে পাশের পাহাড়ি খাদে। দুর্ঘটনার সেইসব ভয়ঙ্কর মুহূর্তের বর্ণনা করতে গিয়ে সাবরিনা বলেন, যখন পেৱনটি থামলো, আমি সিট বেল্ট খুলে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করি। মনে হলো, আমার পা যেন আটকে গেছে। তখন আমার মাথায় একটাই চিন্তা, যেভাবে হোক পেৱন থেকে বের্বতে হবে। কারণ আমার মনে ছিল, এ সময়ে পেৱন বিস্ফোরিত হয়। ভাঙা পা নিয়ে সাবরিনা নিজেকে সিট থেকে মুক্ত করেন এবং পেৱন থেকে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হন। তার কথায়, পেৱনের বাইরে কিভাবে বেরিয়েছি বা পরে কি হয়েছে আমার পরিষ্কার মনে নেই। সাবরিনাকে একটি গাছের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়। সাবরিনা বলেন, আমার মনে আছে, পেৱন থেকে বেরিয়ে আমি হাঁটতে শুর্ব করি। তখন আমার খুব ক্লান্ত বোধ হতে থাকে। আমার চোখ জুড়ে ঘুম আসে। আমি পাশের একটি গাছকে জড়িয়ে ধরি। হাসপাতালের বিছানায় ক্লান্ত সাবরিনা বলেন, তখন আমার মাথায় একটাই চিন্তা ছিল-আমাকে দূরে সরে যেতে হবে। কারণ পেৱনটি যে কোন সময় বিস্ফোরিত হবে। কে আমার পিছনে ছিল, আমার মনে নেই। তবে মনে আছে, চেতনা হারানোর আগে আমি বিমানের দিকে ঘুরে থেকেছিলাম। তখন বিমানটি আগুনে জ্বলছিল দাউ-দাউ করে। আমি মানুষের আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। তারা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল। অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশের মেডিকেল ছাত্রী সাবরিনা নাসরিন হক (২২) ডাক্তার দম্পতি মাহবুবুল হক ও রোকেয়া খাতুনের দুই মেয়ের মধ্যে বড়। গত ২৭ বছর ধরে তাদের পরিবার বাস করে দুবাইয়ে। ভয়ংকর ওই দুর্ঘটনার সময় বিমান থেকে যে আটজন লাফিয়ে পড়ে প্রাণে বেঁচেছেন সাবরিনা তাদের একজন। তার পিতা মাহবুবুল হক সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-আইন শহরের চিকিৎসক। সাবরিনার মা রোকেয়া খাতুন জানান, সাবরিনা পড়েছে ম্যাঙ্গালোরের কস্তুরবা মেডিকেল কলেজে। সেখানে ইন্টার্নশিপের শেষ তিন মাসের কোর্স শেষ করতে দুবাই থেকে ম্যাঙ্গালোরে যাচ্ছিল। সে দু’সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে ফিরছিল সে। বিমান দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার খবর তার পরিবারকে ঘটনার কিছু সময় পরে ফোন করে জানান তারই সহপাঠী ডা. ভরত। তিনি ফোন করে বলেন, সাবরিনার অবস্থা গুর্বতর। সাবরিনাদের গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার সোনাগাজীতে। ম্যাঙ্গালোরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সাবরিনার পরিবারকে সব ধরনের সহায়তা করলেও বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে গত রাত পর্যন্ত কোন যোগাযোগ করা হয়নি বলেও জানান রোকেয়া খাতুন।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...