সাদা জামা

ছোটবেলা বাবাকে হারিয়েছে সোহেল। তার বাবা মুক্তিযোদ্ধের সময় মৃত্যুবরণ করেন। তখন সোহেলের মা ৬ মাসের অন্তঃসত্তা। পিতা হারা ব্যাথাটা সোহেলের মনে বেশি মর্মান্তিক হয়ে দেখা দিতে পারলো না। সোহেল ভুমিষ্ঠ হওয়ার ৪ মাস পূর্বেই সখিনা বেগমের পড়তে হয় সাদা শাড়ি। বিধবা মা অন্যের বাড়ীতে কাজ করে ছেলেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মানুষ করতে লাগলো সোহেলকে। তবে মাত্র চতুর্থ শ্রেণীতে পা রাখলো সোহেল। ১৯৮১ সাল, কিছু দিন পরই স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। সমস্ত বাংলাদেশের মত স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের প্রভাব পরল সোহেলের স্কুলে। প্রধান শিক্ষক ক্লাশে ক্লাশে গিয়ে জানিয়ে দিলেন স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে তোমাদের স্কুলে খেলা হবে। যারা খেলায় অংশগ্রহণ করতে চাও তারা কালো প্যান্ট ও সাদা জামা পড়ে আসবে।
ছুটির ঘন্টা বাজতে না বাজতে দৌড়ে ছুটতে লাগলো সোহেল বাড়ীর দিকে। চৈত্রের প্রচন্ড তাপ উপেক্ষা করে চলছে তো চলছেই। কড়া রৌদ্রে গরম হয়ে উঠা আপেলের মত কঁচি গাল দিয়ে ঝরে পড়ছিল অসংখ্য ঘামের বিন্দু। তবুও মুহূর্তের জন্য থামলো না সে। মাকে গিয়ে এনি বলতে হবে- স্বাধীনতা দিবসে তার সাদা জামা চাই। নইলে আমি কোন খেলায় অংশগ্রহণ করতে পারবো না। অন্য সবাই খেলা দিয়ে জয়ী হবে আর আমি দেখবো তা হবে না। সোহেল আরও দ্রুত দৌড়াতে লাগল, ঘরের প্রান্তে এসেই হাকতে হাকতে ডাকলো; মা, মা-গো।
দু’প্রান্তে উচুঁ দুটি রেল লাইন। মাঝে খানে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। উত্তর কি বা দক্ষিণ বাতাস মোটেও ফাঁকা জায়গাটি স্পর্শ করতে পারে না। তাল পাতার ছাউনী আর পলিথিন দিয়ে বাঁধা বেড়ার আড়াল থেকে মা- কি হয়েছে বাবা এ সকালে চলে এলি যে? ইস ঘেমে একেবারে পুকুর হয়ে গেলি। যা বাবা ঐ ডোবাতে গিয়ে হাত-মুখ ধোয়ে আয়।
সোহেলঃ ও, পরে হবে। তার আগে আমার কথা শুন; স্বাধীনতা দিবসে আমাদের স্কুলে খেলা হবে। আমি খেলা দিব। তোমাকে একটা সাদা জামা এনে দিতে হবে। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো- সাদা জামা! হ্যাঁ। সাদা জামা। সাদা জামা না হলে আমি কিছুতেই স্বাধীনতা দিবসে খেলায় অংশ গ্রহণ করতে পারবো না।
সখিনা বেগম ভাবতে লাগলো এ মুহূর্তে কি করে সে তার ছেলের আবদার রক্ষা করবে। অথচ অনেক দিন হয় সোহেল ছেড়া জামা পড়ে স্কুলে যায়। কি করবেন তিনি। তাই তিনি শাড়ীর আচল দিয়ে সোহেলের ঘাম মুছে আর বলে- তুই বাবা তোর স্যারকে বুঝিয়ে বলিস আমরা খুব গরীব। এ সময়ে আমাদের সাদা জামা কিনা সম্ভব না। কিন্তু সোহেল বেঁকে বসলো না, না আমি কিছুই বুঝি না। যে করে হোক আমার সাদা জামা চাই। স্কুলে ছেলেরা কত সুন্দর সুন্দর জামা পড়ে আসে আর আমি শুধু একটি ছেড়া জামা পড়ে প্রতিদিন স্কুলে যাই। আমি তো সুন্দর সুন্দর জামা চাইনি শুধু একটা সাদা জামা চেয়েছি বলতে বলতে সোহেল কাঁদতে লাগলো। সোহেলের চোখের জল আর কাউকে স্পর্শ করতে না পারলেও স্পর্শ করেছে মায়ের কোমল হৃদয়কে। ভিতরে ভিতরে দগ্ধ হচ্ছে আর ভাবছে।
একমাত্র বুকের ধন সোহেল। তার অভিমান ভরা কথাগুলো অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু কোন উপায়তো আমি দেখছিনা। আমার একমাত্র চোখের মনি এ সোহেল। কিন্তু তাকে জামা কাপড় দেয়া তো দূরের কথা ঠিক মত দু’মুঠু ভাত দিতে পারি না। তবুও জমাট বাঁধা কান্নাকে গোপন করে সখিনা বেগম বললেন- তুই তো সবই জানিস কত কষ্ট করে তোকে লেখা-পড়া শেখাচ্ছি। আর কয়টা দিন অপেক্ষা কর তোকে ঠিকই সাদা জামা এনে দেব। সোহেল গাল ফুঁলিয়ে বলল কয়টা দিন পরে জামা দিয়ে কি করবো? তোমায় আমি বলে দিচ্ছি মা, যদি এ দু’দিনের মধ্যে সাদা জামা না পাই তাহলে আমি আর স্কুলে যাব না। আমাকে খুজেও পাবে না। মা অনেক ভেবে চিন্তে বললেন, দেখি তোর সেলিম চাচার বাড়ী গিয়ে তার ছেলের কোন সাদা জামা পাইনি।
সান্তনার বাণীর কানে নিয়ে সোহেল পরের দিন স্কুলে যাচ্ছে। অতীত দিনের মত তার মনে এখন আর আনন্দ নেই। স্কুলে যেতে যেতে সে ভাবলো স্বাধীনতা দিবসে সে নিশ্চয় খেলায় জয়ী হবে। সবার সামনে থেকে পুরস্কার নিয়ে আসবে। ওহ! কি মজা হবে। আর মা তা দেখে কতই না খুশি হবে। কাশে বসাকালীন হঠাৎ করে সোহেলের চোখের পর্দায় ভেসে উঠল মায়ের মলিন মুখখানা। ভাবতে লাগলো মা কোথায় থেকে সাদা জামা জোগার করবে। এ ভেবে সোহেল স্যারকে তার সাদা জামা নেই বলতে লাগলো। স্যার সোহেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো- তোমাদের অবস্থা আমি জানি, তোমার সাদা জামা লাগবে না। তুমি সাদা জামা ছাড়াই খেলা দিতে পারবে। স্যারের কথার সাথে মা’র করুন মুখখানা মুহূর্তের মধ্যে আবার চোখের পর্দায় ভেসে উঠল। ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে মাকে বারণ করি আমার সাদা জামা লাগবে না, সেলিম চাচার বাড়ীতে যেতে হবে না। কিন্তু স্কুল ফাঁকি দিব, না। তাই ভেবে সোহেল চুপ হয়ে যায়।
ছুটির ঘন্টা বাজছে আর সোহেল তার কুঁড়ে ঘরের দিকে ছুটতে লাগলো। তার মনে আজ আনন্দের শেষ নেই। গুন গুন করে কি যেন বলছে আর হাঁটছে। ঘরের কাছে গিয়ে প্রতিদিনের মতো সোহেল ডাকলো- মা, মা-গো। কিন্তু কোন সাড়া শব্দ মেলেনি। ভিতরে ঢুকে বইগুলো রেখে হাড়িতে চোখ রাখতেই দেখে খাবারের কিছু নেই। কি যেন ভেবে সে রওনা দিল সেলিম চাচার বাড়ীর দিকে।
রেল লাইনের সমান্তরাল বাহু ভেদ করে যখন সে পিচ ঢালা পথে পা রাখে। কিছুণ হাটার পর দেখতে পেল রাস্তার দ্বারে অনেক লোকের ভিড়। মানুষের শরীর থেকে শরীরের মধ্যে দূরত্ব স্থাপন করে যখন সে চোখ রাখলো তখন দেখতে পেল সাদা কাপড়ে নয় সাদা জামায় ঢাকা মহিলার মুখখানা। সাথে সাথে সোহেল মুখ থেকে জামাটা সরিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো মা, মা-গো। মা, আমার সাদা জামা লাগবে না। আমার সাদা জামা লাগবে না। মা-তুমি কথা বলো, মা-কথা বলো না। কান্নায় স্তব্ধ হয়ে যায় সোহেল। গাড়ী এসে লাশটি নিয়ে যায়। পিচ ঢালা পথে লেগে আছে রক্তের ছাপ। হয়তো কিছু দিন রৌদ্রে শুকাবে আবার বৈশাখের ঝড় হাওয়ায় সাগরের সাথে মিশে যাবে।

লেখকঃ- নাজমুল করিম ফারুক
সাধারণ সম্পাদক
তিতাস উপজেলা প্রেসকাব
তিতাস, কুমিল্লা।
মোবাইলঃ ০১৮১৮-০০৪২৭২

Check Also

দুখী বালকের স্বপ্ন ও অধ্যবসায়ের ফল

মোঃ আলাউদ্দিন:– জুঁই মামণি ভাত খেতে এসো। জুঁই’র মা বললেন। –    আসছি মা। জবাব দিল ...