যারা দলের লোকদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তারা দেশ চালাবে কীভাবে? – খালেদা জিয়া

2010-05-05-15-25-23-022658600-khaleda
এস জে উজ্জ্বল :
রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত বিএনপির মহাসমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, ধানের শীষের শক্তি হচ্ছে, রাজশাহীর জনগণ কিন্তু ফখরুদ্দীন ও মইন উ আহমেদের নীল নকশার নির্বাচনের মাধ্যমে এই এলাকার আসনগুলো কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এই সরকার ফখরুদ্দীন ও মইন উ আহমেদের মনোনীত সরকার। জনগণের সরকার নয়। এ জন্য তারা জনগণের কাছে যে ওয়াদা করেছিল, তা রক্ষা করেনি। তারা ওয়াদা করেছিল, ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়াবে, বিনামূল্যে সার দেবে। এখন চালের কেজি ৩২ টাকা। সারের দাম বিএনপির আমলের চেয়েও বেশি। এই সরকারের হাতে মানুষের জানমালের আর নিরাপত্তা নেই। তাই এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে।
rajshahi
খালেদা জিয়া বলেন, যারা দলের লোকদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তারা দেশ চালাবে কীভাবে? তাদের লুটপাটে দেশ সর্বস্বান্ত হতে বসেছে। আজ ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ আরও কি কি লীগ সারা দেশে টেন্ডারবাজি দখলবাজি করছে। তাদের অত্যাচারে দেশের মানুষ অতিষ্ঠ।
বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, আওয়ামী লীগের চুক্তির পর থেকে পদ্মা নদী শুকিয়ে গেছে। আবার তারা ভারতের স্বার্থে টিপাইমুখে বাঁধ দেওয়ার কথা বলছে। তাহলে সারা দেশই শুকিয়ে যাবে। তিনি বলেন, ভারত ষড়যন্ত্র করছে আর সরকার নীরব থাকছে। এ সরকার দেশপ্রেমিক নয়। তারা ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর, মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেবে, বাংলাদেশের বুকের ওপর দিয়ে ভারত থেকে ভারতে যাওয়ার রাস্তা করে দেওয়া হবে। তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব থাকবে না.
দলের নেতা-কর্মীদের হরতালের জন্য প্রস্তত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, ১৯ মে ঢাকার সমাবেশ থেকে এই সরকার পতনের আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। বেলা আড়াইটায় আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত সময়ে সমাবেশ শুরু করা যায়নি। বিকেল চারটার সময় বৃষ্টি একটু কমলে খালেদা জিয়া মঞ্চে ওঠেন। তিনি বিকেল চারটা ১০ মিনিট থেকে পাঁচটা ২২ মিনিট পর্যন্ত একটানা বক্তব্য দেন।নগরের বিভিন্ন এলাকায় দেড় শ মাইকে সমাবেশের বক্তব্য প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। মহাসমাবেশ উপলক্ষে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। সমাবেশস্থলে সাতটি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে দৃশ্য ধারণ করা হয়। রাজশাহীতে এই প্রথম কোনো সমাবেশে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়। উত্তরাঞ্চলের ১৮টি জেলা থেকে নেতা-কর্মীরা এ সমাবেশে যোগ দেন বলে বিএনপি নেতারা জানান। তারা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন স্থানে সরকার সমর্থকরা তাদের বাধা দিয়েছে। নাটোরে ছাত্রলীগকর্মীদের হামলায় নিহত হয়েছেন বগুড়ার এক বিএনপি নেতা।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে সরকার পরিচালনায় তাদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। দেশে বিদ্যুতের ‘কৃত্রিম’ সঙ্কট তৈরি করে বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ সরকারদলীয়দের দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। দলের নেতা-কর্মীদের সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছেন, আগামী মে মাসে ঢাকার সমাবেশ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, “ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ সরকারি দলের বিভিন্ন সংগঠন সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রীদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। এ সরকার তার দলের লোকজনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। তারা দেশকে কীভাবে চালাবে?” “সরকারের এক নম্বর থেকে শুরু করে দুর্নীতিতে সবাই ব্যস্ত”, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন বিরোধী নেতা। “ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন লুটপাট করে দেশকে শেষ করে ফেলেছে। ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে দেশকে। তাদের সঙ্গে আঁতাত করে এ সরকার ক্ষমতায় এসে পিছিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিতা বজায় রেখেছে।”
ভারতকে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার সমালোচনা করে খালেদা বলেন, “তারা (সরকার) কেবল বিদেশিদের কাছে দেওয়া প্রতিতিগুলো বাস্তবায়নে ব্যস্ত।” দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সঙ্কটের বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, “নিজের লোকজনকে বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎ প্রকল্প পাইয়ে দিতে বিদ্যুতের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। দলীয় লোকজন ও পরিবারের সদস্যদের কাজ দেওয়ায় তিন বছরে দেশের ৭ হাজার কোটি টাকার লোকসান গুনতে হবে।”
বর্তমান বিদ্যুৎ সঙ্কটের জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের নেতারা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারকে দায়ী করে বলে আসছে, ওই সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয়নি। বরং এ খাতে দুর্নীতি হয়েছে।সরকারি দলের দাবি প্রত্যাখ্যান করে খালেদা বলেন, তার সরকারের আমলে ৫ বছরে ১৫শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়।
সমাবেশে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে খালেদা বলেন, চট্টগ্রাম ও খুলনার মানুষের কাছে আন্দোলনের দাবি শুনেছি। কর্মসূচি দিলে রাজপথে থাকবেন কিনা- চেয়ারপারসন জানতে চাইলে রাজশাহীর নেতা-কর্মী-সমর্থকরা সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ সূচক ধ্বনি তোলেন। কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে সমাবেশ থেকে হরতালের স্লোগান দেওয়া হয়।
এরপর খালেদা বলেন, “খুব শিগগিরই কর্মসূচি দেওয়া হবে। বরিশালে সমাবেশে ১২ মে, এরপর ঢাকায়। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করে আমরা এরশাদকে হটিয়েছি। ১৯ মে ঢাকার সমাবেশ থেকে আন্দোলনে কর্মসূচি দেওয়া হবে। আপনারা প্রস্তুতি নিন।”
ভোলা-৩ আসনের উপনির্বাচনে কারচুপি হয়েছে দাবি করে নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করেন খালেদা।তিনি বলেন, “এ নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ কখনোই ছিলো না, এখনো নয়। তারাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিএনপিকে ভাঙার ষড়যন্ত্র করেছে।”
জোট সরকারের আমলের বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা বলেন, এখন কোনো পণ্যই মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নেই।
মাদ্রাসা ময়দানের আশপাশের বিভিন্ন সড়কে পুলিশ গাড়ি চলাচল দুপুর থেকেই বন্ধ করে দেয়। তবে দুপুরের পর জনসমাগম ময়দান ছাড়িয়ে যায়। পাশের দরগাপাড়া, পাঠানপাড়া, সাহেব বাজারসহ আশপাশের এলাকার বড় দালানের ছাদেও মানুষকে দেখা যায়।
বিএনপি নেতারা জানান, ময়দানের বিভিন্ন স্থান থেকে যেন বক্তব্য ভালোভাবে শোনা যায়, সে জন্য ২০০টি মাইক লাগানো হয়, বড় পর্দায় তা দেখানোর ব্যবস্থাও করা হয়। তবে বৃষ্টির কারণে বড় পর্দায় তা দেখানো যায়নি।সমাবেশ স্থলের বিভিন্ন অংশে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বড় প্রতিকৃতি টানানো ছিলো।ঢাকা থেকে রওনা হয়ে খালেদা রাজশাহী সার্কিট হাউজে পৌঁছান দুপুর ৩টা ৪৫ মিনিটে। ২০ মিনিট অবস্থানের পরই তিনি সমাবেশস্থলে যান। মঞ্চে ওঠার পরপরই তিনি বক্তব্য দিতে শুরু করেন।
সভা মঞ্চে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ফজলুর রহমান পটল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, রিজভী আহমেদ, প্রচার সম্পাদক জয়নুল আবদিন ফারুক, স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু প্রমুখ।সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু। স্থানীয় নেতাদের মধ্যে ছিলেন নাদিম মোস্তফা, হারুনুর রশিদ, কামরুল মনির, শফিকুল হক মিলন, আজিজুর রহমান প্রমুখ।খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানিয়ে রাজশাহীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দুই শতাধিক তোরণ তৈরি করা হয়। বিভিন্ন স্থানে উড়ছিলো দলীয় পতাকা।সমাবেশ শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকার পথে রওনা হন খালেদা। এর আগে ডাক বাংলোয় রাজশাহীর নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...