যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তদন্ত সংস্থার প্রধান আবদুল মতিন মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যায় মদতদানকারী : ড. আলাউদ্দিন আহমেদ

alauddin
স্টাফ রিপোর্টার :
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুরু থেকে নিজেরাই গঠিত তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেলসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য করছে। আইনজীবী প্যানেলে সরকারদলীয় দু’জন সংসদ সদস্যের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় প্যানেলে একদফায় রদবদলও আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আলাউদ্দিন আহমেদ তদন্ত সংস্থার প্রধানের অতীত রাজনীতি নিয়ে স্পর্শকাতর মন্তব্য করেছেন। একটি গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্যকালে প্রধানমন্ত্রীর ‘ঘনিষ্ঠ’ এই উপদেষ্টা অভিযোগ করেছেন, আবদুল মতিন মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যায় মদতদানকারী জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের কর্মী ছিলেন। তার মাধ্যমে বিচারের ভবিষ্যত্ কী হতে পারে, সেটা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এদিকে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে তদন্ত না করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত তদন্ত সংস্থার প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া সরকারের দুর্বল কার্যক্রমের পরিচয় বহন করে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক। তার মতে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে সরকারের উপদেষ্টা বা এমপি-মন্ত্রীদের একেকজন একেক ধরনের বক্তব্য দিয়ে নিজেরাই বিষয়টি বিতর্কিত করে ফেলেছেন।
গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে মিডিয়া হাউস ভিশন ২৪ আয়োজিত ‘ইসলাম, আইন ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আলাউদ্দিন আহমেদ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সরকার গঠিত তদন্ত সংস্থার প্রধানের অতীত রাজনীতি তুলে ধরে বলেন, প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা ইসলামী ছাত্রসংঘের একটি কলেজ শাখার সভাপতি পদের জন্য মনোনীত ছিলেন। তিনি এ কমিটির প্রধান হওয়ায় বিচারের অবস্থা কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে আমাদের সিরিয়াসলি ভাবতে হবে।
একাত্তরে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের (যুদ্ধাপরাধ) বিচারে গত ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠন, তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেল গঠন করে সরকার। সাবেক অতিরিক্ত সচিব আবদুল মতিনের নেতৃত্বে গঠিত হয় সাত সদস্যের তদন্ত সংস্থা। সাতজনের মধ্যে প্রধানসহ ৫ জন দায়িত্ব গ্রহণ করে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। মেজর জেনারেল (অব.) হাসান আরিফসহ অপর আরেকজন এখনও কাজে যোগদান করেননি। জানা গেছে, তাদের দু’জনের কেউই যোগ দেবেন না। গতকালের গোলটেবিলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, মতিনের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনেই তদন্ত সংস্থার এক সদস্য কাজে যোগ দেননি। তবে তাকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জরুরি সরকারের সময় গ্রেফতার হওয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে বিশেষ আদালতে আইনি লড়াইকারী গোলাম আরিফ টিপুকে প্রধান করে গঠন করা হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সরকারপক্ষের আইনজীবী প্যানেল। তবে এ প্যানেলে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ঢাকা-৪ অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম ও পঞ্চগড়-২-এর অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম সুজনকে মনোনয়ন দেয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ওই দু’জনকে বাদ দেয়া হয়। তখন ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেলের নাম ঘোষণা হলেও এখনও পর্যন্ত অর্ধেকের নিয়াগ প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও তদন্ত সংস্থা এবং আইনজীবী প্যানেল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সম্প্রতি আমার দেশকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাত্কালে তিনি আইনজীবী প্যানেলের প্রধানকে ‘বাছুর’ আইনজীবী বলে আখ্যায়িত করেন। তদন্ত সংস্থার প্রধানকেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের জবাবে তখন এক সংবাদ সম্মেলনে আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছিলেন, আবদুল মতিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। তাকে দিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব। আর এসব পক্ষ-বিপক্ষের মন্তব্যের সূত্র ধরে ড. আলাউদ্দিন আহমেদ গতকাল তদন্ত সংস্থার প্রধানকে নিয়ে এরূপ মন্তব্য করে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিলেন।
এদিকে ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া মহাজোট শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বক্তব্যকালে তদন্ত কমিটি ও আইনজীবী প্যানেল দুর্বল এবং ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকলে তা প্রধানমন্ত্রীকে খতিয়ে দেখে পুনর্গঠনের অনুরোধ করেন।
ড. আলাউদ্দিনের এই মন্তব্যের বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভিন্ন মতাদর্শের কাউকে সম্পৃক্ত করা যাবে না—এ নীতিতে আমি বিশ্বাসী নই। তবে যারা যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের এখানে নিয়োগ দেয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তদন্ত সংস্থার প্রধানের অতীত ইতিহাস নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক প্রশ্নে সরকারের দুর্বলতার কথা তোলেন শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, এরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাউকে নিয়োগ দেয়ার আগে সরকারের আরও যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজনীয়তা ছিল। এখন সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কথায় মনে হচ্ছে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটা সেভাবে তদন্তের ভিত্তিতে হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এরূপ কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার আরও সতর্ক হবে বলে আশা করেন তিনি।
এদিকে যুদ্ধাপরাধীর বিচার ইস্যুতে সরকারের নীতিনির্ধারণী ব্যক্তিদের একের পর এক বিতর্কিত পরস্পরবিরোধী মন্তব্য প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, যেটা যার দফতরের, সেটা নিয়ে তারই মন্তব্য করা উচিত। বিচ্ছিন্নভাবে একেকজন একেক কথা বলেই বিতর্কিত করছেন। মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। সরকার গঠিত ট্রাইব্যুনাল নিয়ে সরকার থেকে এরূপ মন্তব্য না করাই শ্রেয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রিপোর্টার্স ইউনিটির গোলটেবিলে অন্যদের মধ্যে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী, জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সাবেক মন্ত্রী জাফর ইমাম, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, সাংবাদিক নঈম নিজাম প্রমুখ।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...