বাখরাবাদ গ্যাস দ্বি-খন্ডিত করা হলে কঠোর আন্দোলন : কুমিল্লাকে বাইপাস করে ঢাকা-চট্টগ্রাম বিকল্প মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিলসহ কুমিল্লাকে বিভাগ ঘোষণার দাবী

bakhrabad gas system
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কুমিল্লা থেকে :
কুমিল্লার বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস লিমিটেডকে দ্বি-খন্ডিত করে কর্ণফুলী গ্যাস নামে চট্টগ্রামে পৃথক গ্যাস কোম্পানী স্থাপন প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে এবং কুমিল্লাকে বাইপাস করে দাউদকান্দি হতে ফেনীর রামপুর পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম বিকল্প মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিলসহ কুমিল্লাকে বিভাগ ঘোষণার দাবীতে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়েছে কুমিল্লা বাঁচাও আন্দোলন। গতকাল ২৪ এপ্রিল শনিবার সকাল ১১টায় কুমিল্লা বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তন কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মরত সাংবাদিক, রাজনীতিক, সামাজিক ও পেশাজীবি মহলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আজ রোববার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে অবস্থান ও গণসমাবেশের ডাক দেয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাখরাবাদ গ্যাসকে দ্বিধা-বিভক্ত করে কর্ণফুলী গ্যাস নামে পৃথক কোম্পানী স্থাপনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান অসাংবিধানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কুমিল্লাবাসী ও বাখরাবাদ কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে সাবেক সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে অনশনজনিত উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পিছু হটে। পেট্রোবাংলার বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোঃ হোসেন মনসুর সরকারি গেজেট অমান্য করে একতরফা আদেশে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানীর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পদক্ষেপ নেন। এ ধরণের পদক্ষেপ বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানী অচিরেই বিলুপ্ত করার গভীর ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করা হয়।
কুমিল্লা বাঁচাও আন্দোলনের সদস্য সচিব কামরুল আহসান বাবুল লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম আঞ্চলিকতাবাদী মনোভাবের কারণে কুমিল্লাবাসী হারিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়, হারিয়েছে শিক্ষাবোর্ডের অংশ। এছাড়া মৎস্য অধিদপ্তরসহ অনেক বিভাগীয় কার্যালয়ও চট্টগ্রামে স্থানান্তর করে নেয়া হয়েছে। আজ হারাতে বসেছে বাখরাবাদ গ্যাস। অন্যদিকে, কুমিল্লাকে পঙ্গু করতে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব কমাতে ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দাউদকান্দির হাসানপুর হতে ফেনীর রামপুর পর্যন্ত বিকল্প মহাসড়ক নির্মাণ কাজের দরপত্র আহবান করা হয়েছে, যা’ বাস্তবায়ন হলে কুমিল্লা আর্থিকভাবে পঙ্গুত্ববরণ করবে এবং কুমিল্লা একটি অবহেলিত বিচ্ছিন্ন জনপদের জেলায় পরিণত হবে। তিনি বলেন, কুমিল্লাবাসীর ন্যায়সঙ্গত মৌলিক দাবী আদায়ের লক্ষ্যে কুমিল্লার সকল সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, সকল পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক, পেশাজীবি মহলের অংশগ্রহণ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে ‘কুমিল্লা বাঁচাও আন্দোলন’।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা দেখা দেয়ায় ওই সমস্যার স্বল্প মেয়াদী ও সহসা বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ প্রণয়ন করার জন্য ওই সালের ৩ জুলাই বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানকে আহবায়ক করে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে দৃষ্টি না দিয়ে চট্টগ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় ওই সময় ড. হোসেন জিল্লুর রহমান আঞ্চলিকতার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে জনদাবীর মিথ্যা অজুহাতে গেজেট অনুযায়ী তার কার্যপরিধির তোয়াক্কা না করে বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস্ লিমিটেড (বিজিসিএল)কে বিভক্ত করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে কর্ণফুলী গ্যাস ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড (কেজিডিসিএল) নামে একটি পৃথক কোম্পানী গঠনের প্রস্তাব করেন। বিজিএসএল থেকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক করা হলে মাত্র ৫০-৬০ মিলিয়ন ঘণফুট গ্যাস বিক্রি করে মূল কোম্পানীটি টিকে থাকতে পারবে না মর্মে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব ওই সময় তিতাস গ্যাস টিএণ্ডডি কোম্পানীর আশুগঞ্জসহ বি-বাড়িয়াকে বিজিএসএল’র সাথে অন্তর্ভূক্ত করে বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা ও বৃহত্তর নোয়াখালী জেলা নিয়ে বাখরাবাদ গ্যাস ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানী গঠনের প্রস্তাব করেন। ওই প্রস্তাবটি পরবর্তীতে ২০০৮ সালের ১৯ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অনুমোদন দেয়া হয় এবং একই সালের ১৭ নভেম্বর গেজেট নোটিফিকেশনে প্রকাশ করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ ধরণের কার্যক্রম দেশের সংবিধানের ৫৮ (ডি) ধারার সুস্পষ্ট লংঘন ও ১৯৯৪ সালের কোম্পানী আইনের ১২ ধারার পরিপন্থী এবং উক্তরূপ কর্মকান্ড কুমিল্লাবাসীর জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। তিনি বলেন, বিজিএসএলকে বিভক্তির বিষয়ে ২০০৩ সালের ২ অক্টোবর চার দলীয় জোট সরকারের সময়ে তৎকালীন কেবিনেট সচিব ড. সা’দাত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উন্নয়ন সচিব কমিটির সভায় তা’ আলোচনার পর কোটি কোটি টাকা অপচয়ের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় বিভক্ত না করে প্রশাসনিক ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধিসহ জবাবদিহীতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয় এবং পরবর্তীতে মন্ত্রী পরিষদ সভায় বিজিএসএলকে বিভক্ত করার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়া হয়েছিল।
বর্তমান সরকারের আমলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান চট্টগ্রাম আঞ্চলিকতাবাদীদের দ্বারা পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রভাবিত হয়ে সরকারি গেজেট অনুযায়ী বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানীকে পুনঃগঠিত না করে কুমিল্লার ৯০ শতাংশ গ্যাস নিয়ে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানী স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করে। বাকী ১০ শতাংশ গ্যাস দিয়ে বাখরাবাদ অকার্যকর কোম্পানীতে পরিণত হয়ে অবশেষে কোম্পানীটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় না এনে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোঃ হোসেন মনসুর কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানীর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর বেআইনী প্রক্রিয়া চালাতে থাকেন। গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে নজর না দিয়ে কোটি কোটি টাকা অপচয়ে বিতরণ কোম্পানীগুলোকে বিভক্ত করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তড়িঘড়ি করে বাখরাবাদের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার কর্মচারীদের তথাকথিত কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানীতে প্রেষণে বদলীর আদেশ দেন এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের লক্ষ্যে কথিত কোম্পানীকে ঋণ প্রদানের জন্য বাখরাবাদ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এ ধরণের কর্মকান্ডের প্রতিবাদে আজ ২৫ এপ্রিল রোববার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে অবস্থান ও গণসমাবেশের ডাক দেয়া হয়েছে। উক্ত অবস্থান ও গণসমাবেশে কুমিল্লা বাঁচাও আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, কুমিল্লা প্রেসক্লাব সভাপতি রমিজ খান, কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্স এণ্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি রোটাঃ মোঃ শাহজাহান সাজু, বাখরাবাদ সিবিএ’র সভাপতি আবুল খায়ের সরকার, সাধারণ সম্পাদক কাজী আবু মোঃ নওশাদ, বাখরাবাদ গ্যাস শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কাশেম, সাবেক ছাত্র নেতা মীর্জা জালাল উদ্দিন বাদল খান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ঐক্যজোটের আহবায়ক ওবায়দুল কবির মোহন ও বশির আহমেদ।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...