পাহাড়ে সংঘর্ষ গোলাগুলি দুই শতাধিক বাড়ি ঘরে আগুন : ৪ পাহাড়ি নিহত

rangamati
এস জে উজ্জ্বল :
ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট, সীমানাছড়া,গঙ্গারামমুখসহ ১৫টি গ্রামের বাঙালি, পাহাড়ি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। গোলাগুলি হয়েছে সেনাবাহিনী ও উপজাতি সন্ত্রাসীদের মধ্যে। গুলিতে ৪ পাহাড়ি নিহত হয়েছে বলে উপজাতীয় নেতারা দাবি করেন। তবে সরকার পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে এখনও কিছু জানানো হয়নি। সংঘর্ষ চলাকালে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা বাঙালিদের দুই শতাধিক বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। শুক্রবার রাত ১১টা থেকে গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত চারদিকে আগুন জ্বলছিল।ঘটনায় অন্তত ২০০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়।ইউএনও, ওসি, সাংবাদিকরা পাহাড়ের আড়ালে মাটিতে শুয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। এ সময় বাঘাইহাট জোন কমান্ডার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। এ সময় উপজাতীয়দের ছোড়া গুলি মাথায় লেগে সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট রেজাউল করিম আহত হয়েছেন। জরুরিভাবে তাকে হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রামে সিএমএইচে পাঠানো হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাঘাইছড়ি সদরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘটনার জন্য বাঙালি ও উপজাতীয়রা একে অপরকে দায়ী করেছে। ইউপিডিএফ দাবি করেছে, গুলিতে লক্ষ্মী জোতি চাকমা ও বুদ্ধ প্রদি চাকমা নামের দুজন নিহত হয়েছে। সন্তু লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতি দাবি করেছে, লক্ষ্মী জোতি চাকমা ও মৃত্যুঞ্জয় চাকমা নামের দুই উপজাতীয় নিহত হয়েছে। অপরদিকে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি দাবি করেছেন, উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা ৫ বাঙালিকে অপহরণ করেছে। এরা হলেন আরিফ, হানিফ, ইয়াছিন, ইয়াকুব আলী, হলুদ ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ৮০ রাউন্ড গুলি হয়েছে, অন্যদিকে পাহাড়িদের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে দুই থেকে আড়াইশ’ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে। এক সেনা কর্মকর্তাকে অপহরণের চেষ্টা করেছে উপজাতীয়রা।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী জানান, পরিস্থিতি এখন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সব ধরনের সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল নিষিদ্ধ করে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। আহত নিহতের কোনো তথ্য তার কাছে নেই বলে জানান তিনি। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএসএম হুমায়ন কবির এক উপজাতীয়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
বাঙালিরা অভিযোগ করেন, শুক্রবার রাত ১১টা থেকে কয়েকশ’ পাহাড়ি অস্ত্রশস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও গুলতি নিয়ে বন বিহারসহ বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে বাঙালিদের বাড়িঘরে আগুন লাগাতে থাকে। অন্যদিকে পাহাড়িদের অভিযোগ, বাঙালিরাই তাদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাঘাইছড়ি উপজেলা সদর ও বাঘাইহাটে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে প্ররিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন।
জানা গেছে, রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকায় বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। গত ১৮ জানুয়ারি থেকে পাহাড়িরা বাঘাইহাট বাজার বর্জন করে আসছিল। বাঘাইহাট থেকে সাজেক পর্যন্ত চলছে না যানবাহন। প্রশাসন কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়েও পাহাড়িদের মন গলাতে না পারায় পরিস্থিতির কোনো উত্তরণ ঘটেনি। শুক্রবার রাত ১০টায় সীমানাছড়া, রেইতকাবা মুখ ও বিভিন্ন রাস্তার আশপাশে অন্তত ৩০টি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকাল ১০টার দিকে বাঘাইছড়ির ইউএনও এএসএম হুমায়ুন কবির, ওসি নইম উদ্দিন, বাঘাইছড়ি জোন কমান্ডার লে. কর্নেল ওয়াসিমসহ সেনাবাহিনীর ১০/১২ জনের দল গঙ্গারামমুখ এলাকায় গেলে পাহাড়িরা আবারও বাঙালিদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। এ সময় উঁচু পাহাড় থেকে এলোপাতাড়ি বৃষ্টির মতো গুলি আসতে থাকে। সেনা সদস্যরা এগিয়ে গেলে পাহাড়িরা সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট রেজাউল হককে কুপিয়ে আহত করে। ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় প্রশাসনের কর্তারা অবরুদ্ধ হয়ে থাকেন। ঘটনার পর খাগড়াছড়ি জেলার সঙ্গে রাঙামাটির সাজেক, বাঘাইহাট ও বাঘাইছড়ি সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে এলাকা ছাড়ছে বাঙালি ও উপজাতি উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন। কারা গুলি ছুড়েছে এ নিয়ে কেউই দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেনি। তবে বাঘাইহাট জোনে গুলি চালালে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ৩/৪ রউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণের কথা স্বীকার করা হয়। সাজেক থেকে ফেরার পথে মাচালং এলাকায় কাঠের সেতু জ্বালিয়ে দিয়ে খাগড়াছড়ির ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সালেহীনকে অবরুদ্ধ করে রাখে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। অতিরিক্ত সেনাবাহিনী গিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
বাঙালি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি আলমগীর কবীর জানান, গঙ্গারামমুখ এলাকায় বাঙালিরা এখন সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সকালে পাহাড়িদের গুলির মুখে বাঙালিরা বাজার ও স্থানীয় স্কুলে আশ্রয় নেয়। এসময় মোঃ আরিফ, মোঃ হানিফ ও মোঃ ইয়াছিন এবং বাঘাইহাটের মোঃ ইয়াকুবকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে ইউপিডিএফ’র সন্ত্রাসীরা।
rangamati 1
তিনি অভিযোগ করেন, ইউএনডিপি, ডব্লিউএফপিসহ বিদেশি সংস্থাগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য তারা এই ষড়যন্ত্র করছে। কদিন আগে সিএইচটি কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামে সফরে এসে প্রথমে ইউএনডিপি’র খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি প্রিয়তর চাকমা ও ডব্লিউএফপির কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে। তারপর তারা বাঘাইহাটের গঙ্গারামমুখ এলাকায় গিয়েও পাহাড়িদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে। তিনি অভিযোগ করেন, সিএইচটি কমিশনের ইন্ধনে এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বাঘাইহাটের ঘটনার জের ধরে দীঘিনালা কলেজে সংঘর্ষে ৩ বাঙালি ছাত্র আহত হয়েছে।
ইউপিডিএফের রাঙামাটি জেলার শীর্ষ নেতা মাইকেল চাকমা জানান, সেনাবাহিনীর উস্কানিতে গতকাল রাতে বাঙালিরা পাহাড়িদের ৩৫টি ঘর জ্বালিয়ে দেয়। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে দু’জন পাহাড়ি নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে বোদ্ধজ্যোতি চকমার লাশ পাওয়া গেলেও অন্যদের লাশ সেনাবাহিনী নিয়ে গেছে।
এদিকে বাঘাইছড়ির ঘটনার প্রতিবাদে জেএসএস গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে করেছে। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেএসএস রাঙামাটি জেলা সভাপতি গুনেন্দু চাকমা, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সজিব চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি উদয়ন ত্রিপুরা। বক্তারা বাঘাইছড়ির ঘটনার জন্য সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জেএসএস ঘটনার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে একটি বৈঠক করছিল। এ বৈঠক থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার কথা রয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে ইউপিডিএফ রাঙামাটির কুতুকছড়িতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে। ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা জানান, সহযোগী সংগঠন গণতান্ত্রিক যুবফোরামের ডাকে আগামীকাল রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি জেলায় নৌ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে।
এদিকে বাঘাইহাটে অগ্নিসংযোগ ও হামলার প্রতিবাদে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ রাঙামাটিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে। সংবাদ সম্মেলনে নেতারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনকে (সিএইচটি কমিশন) অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। তাদের অভিযোগ, সিএইচটি কমিশন ও বিদেশি কিছু দাতাগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালি উচ্ছেদের পরিকল্পনা নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। সাংবিধানিকভাবে তিন পার্বত্য জেলা দেশের অন্যান্য জেলার মতো উপজাতীয় ও বাঙালি সবার সমান অধিকার নিয়ে এখানে আমরা সবাই বসবাস করব। কিন্তু কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও তাদের এদেশীয় কিছু দালাল পার্বত্য জেলাগুলো থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে। নির্বিচারে বাঙালিদের ওপর জুলুম-নির্যাতন ও দমন অভিযান চালানো হচ্ছে। পাহাড়ি বাঙালি নির্বিশেষে সবার জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তারা প্রশাসনের প্রতি দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি মোঃ শাহজাহান আলম, সমঅধিকার আন্দোলনের সদর উপজেলা সভাপতি পেয়ার আহমদ খান, মাসুদ পারভেজ, আবদুল মান্নান, মোঃ রিয়াদ প্রমুখ। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াদুদ ভূঁইয়া এক বিবৃতিতে বলেন, উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাঙালিদের শতাধিক ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। পাহাড়ি ও বাঙালিরা আন্তরিকভাবেই পার্বত্য জেলাগুলোতে বসবাস করে আসছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই উভয়ের মধ্যে বিরোধ লাগিয়ে বাঙালিদের বিতাড়িত করার পথ করা হয়। তথাকথিত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে এলাকা থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার ও উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে বাঙালিদের উচ্ছেদের চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্বর হামলাকারী উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে দুপুরে স্থানীয় বাঘাইহাট সেনা অঞ্চল (জোন) সদরে তাত্ক্ষণিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে খাগড়াছড়ি সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এম সালেহীন বলেন, সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর ওপর গুলি চালালে আত্মরক্ষার জন্য সেনাসদস্যরা তিনটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। তবে বাকি গোলাগুলি কারা করেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাঘাইহাটের চলমান ঘটনাকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, পাহাড়ি-বাঙালি উভয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পাহাড়ের শান্তি নষ্ট করতে এসব ঘটনার পেছনে ইন্ধন দিচ্ছে। তবে তিনি দলটির নাম বলেননি।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...