অশান্ত কুমিল্লার শিক্ষাঙ্গন : ছাত্রলীগের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড

কামরুল হাসান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় :
সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের প্রতিনিয়ত বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে দিন দিন অশান্ত হয়ে উঠছে কুমিল্লার শিক্ষাঙ্গন। অস্ত্রের মহড়া আর ঝনঝনানির মধ্যেই পড়াশোনা করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। আধিপত্য বিস্তার, হল দখল, নিয়োগবাণিজ্য, ভর্তিবাণিজ্য এবং টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে তারা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ, ভিক্টোরিয়া কলেজ, সরকারি কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই চলছে তাদের অস্ত্রের মহড়া। গত এক বছরে কুমিল্লার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০টি সন্ত্রাসী ঘটনায় আহত হয়েছে শতাধিক। অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থেকেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। ফলে মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম।
সর্বশেষ গত ৪ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ক্লাবভিত্তিক দুটি সংগঠন মেডিসিন ক্লাব ও লিও ক্লাবের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে বন্ধ করে দেয়া হয় ক্যাম্পাস। যেখান থেকে ছাত্ররা ডাক্তার হয়ে দেশ ও জাতির সেবা করবে, সেখানে চলছে অস্ত্রের রাজনীতি। শুধু ছাত্ররাই নয়, তাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে ডাক্তাররাও। সবকিছুই চলছে স্বাচিপের ডাক্তারদের কথামত।
গত ৩০ জানুয়ারি ভিক্টোরিয়া কলেজে বহিরাগতদের নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপ। পুলিশের সামনে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে ককটেল ও গুলি ছোড়ে। আহত হয় ১০ জন। বন্ধ হয়ে যায় ভর্তি কার্যক্রম। অসহায়ের সুরে অধ্যক্ষ আবদুল মতিন জানান, কী করব, ক্ষমতা তাদের। তাদের জন্য সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করাও কঠিন।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি সরকারি কলেজে এক ছাত্রলীগ নেতাকে ছুরিকাহত করে অপর গ্রুপের নেতাকর্মীরা।
এদিকে গত এক বছরে ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খলতায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল ৬ মাসেরও বেশি সময়। চারটি সংঘর্ষে অচল হয়ে পড়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। প্রতিনিয়ত অস্ত্রের মহড়ায় আতঙ্কিত সাধারণ শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদলের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এতে আহত হয় ৮ ছাত্রদল কর্মী। কিন্তু অন্ধ প্রশাসনের সিদ্ধান্তে বহিষ্কার করা হয় ছাত্রদল কর্মী গিয়াসকে। মার্চে টেন্ডার শিডিউল ক্রয়কে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। ২৮ এপ্রিল নবীন বরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের বিবদমান দুটি গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়া হয়। ৩১ আগস্ট আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে গ্রুপ দুটি। আহত হয় উভয় পক্ষের ২০ নেতাকর্মী। আবারও ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়া হয়। ৩৩ দিন বন্ধের পর খোলার প্রথম দিনেই ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করে ভিসির পদত্যগ দাবিতে শুরু হয় ছাত্রলীগের আন্দোলন। ৭ অক্টোবর হলে ওঠাকে কেন্দ্র করে শিবির কর্মীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। রিভলভার, রামদা, চাপাতি, রড ও বিপুল পরিমাণ লাঠিসোটা নিয়ে ক্লাস করতে আসা শিবিরকর্মীদের ওপর হামলা চালায় তারা।
এ সময় শিবিরের নেতাকর্মীরা প্রাণরক্ষার্থে ক্যাম্পাসের আশপাশের বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নিলে সেখানে গিয়ে তাদের এলোপাতাড়ি কোপায় ছাত্রলীগ কর্মীরা। মারাত্মক আহত হয় শিবিরকর্মী শাহাদাত। রামদার কোপে তার হাতের একটি আঙ্গুল ও পায়ের দুটি রগ কেটে দেয়। লুটপাট করে পার্শ্ববর্তী শিবির নিয়ন্ত্রিত মেসে। দুটি মোটর সাইকেল, দুটি কম্পিউটারসহ প্রায় ৩ লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুট করে নেয়। এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষ আবার অনির্দিষ্ট কালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়। গত বছর ৪ আগস্ট দেবীদ্বার সরকারি কলেজে ছাত্রদল কর্মীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এতে আহত হয় ৫ ছাত্রদল কর্মী। কিন্তু উল্টো ছাত্রলীগের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার করা হয় স্থানীয় ছাত্রদল নেতা রিমনকে।
এ ব্যাপারে কুমিল্লা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মিঠু আমার দেশকে জানান, ছাত্রলীগ নামধারী কিছু উচ্ছৃঙ্খল ছেলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে। তবে এর জন্য শুধু ছাত্রলীগকেই দায়ী করা ঠিক হবে না। এভাবেই প্রতিনিয়ত সরকারের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সারাদেশের মতো অচল হয়ে পড়ছে কুমিল্লার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। কিছু সন্ত্রাসীর কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস হতে পারে ন। এভাবে প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলতে থাকলে জাতি মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং ইন্ধনদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...