শীতের তীব্রতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে জনজীবন বিপর্যস্ত

fogy weather
কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক :
শীতের তীব্রতা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বয়ে যাওয়া শৈত্য প্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শীতবস্ত্রের অভাবে চরম দুর্ভোগে আছেন দরিদ্ররা। বৃদ্ধি পেয়েছে শীতজনিত বিভিন্ন রোগ। এসব রোগে গ্রামের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ঠাণ্ডা ও শীতজনিত রোগে গত ২ দিনে বগুড়ায় ২, সিরাজগঞ্জে ৫, ভাঙ্গায় ১, মিঠামইনে ১, কুড়িগ্রামে ২, গাইবান্ধায় ১, পার্বতীপুরে ১, পাঁচবিবিতে ১, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৪, ফরিদপুরে ২, নীলফামারীতে ২ ও দিনাজপুরে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ঘন কুয়াশার কারণে কয়েকদিন সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। নিতান্ত কাজ না থাকলে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। সন্ধ্যার পরপরই লোকজন ঘরে ফিরছে। সন্ধ্যায় দোকানপাট বন্ধ করে দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা।
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের আউচারপাড়া এলাকার প্রচণ্ড শীতে শনিবার বৃদ্ধ ময়েজ উদ্দিন (৯৫) এবং পৌর এলাকার ইটভাটা শ্রমিক কিনু মিয়ার (৬৫) মৃত্যু হয়েছে।
রংপুরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বৃদ্ধ-শিশুরা ক্লোল্ড ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। গত দু’দিনে এসব রোগে আক্রান্ত প্রায় ৮০ জন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. কে কে পাল বলেন, গত দু’দিনে শীতজনিত রোগে হাসপাতালে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।
এরা হলেন- উলিপুর উপজেলার বাগুয়া গ্রামের নিবারণ (৮০) ও সদরের কাঠালবাড়ী এলাকার মেছের (৫০),এ ছাড়া নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৩ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলেও তিনি জানান।
টিডিএইচ ফাউন্ডেশন পরিচালিত কুড়িগ্রাম স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সমন্বয়কারী প্রণব কুমার রায় বলেন, গত দুই দিনে শীতজনিত পাতলা পায়খানা, সর্দি-কাশি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ৩০৯ জন চিকিৎসা নেয়। এর মধ্যে ১৪২ জন ছিল শিশু।
জেলা প্রশাসক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সোমবার চরাঞ্চলের পাঁচ শ’ চাদর বিতরণ করা হয়েছে। শীতবস্ত্র সংগ্রহও বিতরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
গত দু’দিনে সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার হরিনচরা গ্রামের আবদুর রহমান (৭৩), টুকরো ছোনগাছা গ্রামের আমির আলী (৭), বেলকুচি উপজেলার রান্ধুনীবাড়ী গ্রামের আবু সাঈদ খান (১০৩), কামারখন্দ উপজেলার চক-শাহবাজপুর গ্রামের ৩২ দিনের শিশু মেরী, ঘাপরী গ্রামের ১৪ দিনের শিশু আকলিমা খাতুন।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার পূর্ব হাসামদিয়া গ্রামের কৃষক আঃ রশিদ শেখ (৬০) প্রচণ্ড শীতে তার জমিতে কাজ করার সময় মৃত্যুবরণ করেন।ফরিদপুরে তীব্র শৈত্য প্রবাহে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় জন প্রতিনিধিরা জানান। ফরিদপুরের আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুরুজুল আমীন বলেন, সোমবার ফরিদপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০.২ ডিগ্রি এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রোববার ভোরে কিশোরগঞ্জের বড় হাওরে আসা কৃষক আঃ আলী (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ প্রচণ্ড শীতের কারণে নিজ জমিতে কাজ করতে গিয়ে জ্ঞান হারান।
কুড়িগ্রামে ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে দিনের অধিকাংশ সময়। বৃষ্টির মতো টপ টপ করে পড়ছে কুয়াশার ফোঁটা। শনিবার রাতে ফুলবাড়ী উপজেলার পানিমাছকুটি গ্রামের জয়মন বিবি তীব্র শীতে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে মারা গেছেন। ৮টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গত দু’দিনে দুই শতাধিক শিশু শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।
ঠাকুরগাঁও জেলার তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। শীত ও শীতজনিত রোগে রোববার চার জনসহ গত তিনদিনে ১৪ জন মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিউমোনিয়া আক্রান্ত ৮৫টি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সদর উপজেলার রহিমানপুর গ্রামের আবদুল জব্বার মথুরাপুর গ্রামের আবদুল খালেক, হাজিপাড়ার হাসিনা বেগম, ঘনিমহেষপুর গ্রামের বৈজদ্দিন, কুজিশহর গ্রামের আসিরউদ্দিন, পুরাতন ঠাকুরগাঁওয়ের পার্বতী রানী, চিলারং গ্রামের শমসের আলী, গড়েয়ার রইসুল আলী, বসিরপাড়ার তসলিম উদ্দিন, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার দুয়োসুয়ো গ্রামের হেমলতা বেওয়া, স্কুলের হাটের আফিয়া বেওয়া, ফুলতলা গ্রামের দবিরুল ইসলাম, ফকিরবস্তির আসিরউদ্দিন ও পীরগঞ্জের জাবরহাটের খায়ের আলী গত তিন দিনে মারা গেছেন।অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল মান্নান বলেন, রোবিবার প্রশাসনের লোকজন জেলার বিভিন্ন স্থানে কম্বল বিতরণ করেছে।
শহরের রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইয়াকুব আলী বলেন, শীতের জন্য রোববার এই বিদ্যালয়ে ৫০ ভাগ ছাত্রই অনুপস্থিত ছিল। সিএম আইয়ুব বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মনোয়ারা চৌধুরী বলেন, সোমবার তার স্কুলে ৩০ শতাংশ ছাত্রী আসেনি।
দিনাজপুর জেলায় শীতজনিত কারণে গত দু’দিনে ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তারা হলেন_ সদর উপজেলার উত্তর মহেশপুর গ্রামের সত্যরঞ্জন বসাক (৬৫), ঘোড়াঘাট উপজেলার চোপাগাড়ি গ্রামের রিয়াজউদ্দীন (৮০), খানসামা উপজেলার গোয়ালডিহি গ্রামের আরজিনা বেওয়া (৬৭), একই উপজেলার ভাবকি গ্রামের ভিক্ষুক সোলেমান (৭১), এনজিও কর্মী পরেশ দেশাই (৫৮), নবাবগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর সুবল ওরাও (৭৮) এবং হাকিমপুর উপজেলার দেড় মাসের এক শিশু
চাঁদপুরে ঘন কুয়াশা ও শৈত্য প্রবাহের কারণে মেঘনা, ডাকাতিয়া ও ধনাগোদা নদীতে জেলেরা মাছ শিকারে যেতে পারছে না। এ কারণে জেলার ২৩ হাজার জেলে পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে।
চাঁদপুর শহরের পালবাজার ও বিপণীবাগ এলাকার মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, জেলেরা নদীতে যেতে না পারায় বাজারে মাছ সংকট দেখা দিয়েছে। এখন পুকুরের মাছ বিক্রি করতে হচ্ছে। চাঁদপুর শহরের পুরানবাজারের হরিসভা এলাকার জেলে আবু বকর বলেন, “গত ৩/৪ দিন ধরেই আমরা কুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে নদীতে যাইতে পারি নাই। দিন দিন দেখতাছি অবস্থা খারাপ অইতাছে। বেকার থাইক্যা অভাব-অনটনে জীবন কাটতাছে আমাগো।”
নীলফামারীতে গত চার দিন জেলায় সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। মানুষ সহজে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। জেলার হাসপাতালগুলোতে শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
নীলফামারীর সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল মজিদ বলেন, রোববার রাতে শীতজনিত রোগে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। সৈয়দপুর হাসপাতাল এবং চার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিভিন্ন রোগে অন্তত ১৫০ জন ভর্তি রয়েছে বলে তিনি জানান।
সৈয়দপুর বিমানবন্দরের আবহাওয়া অফিসের স্টেশন ম্যানেজার সহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, খালে-বিলে এখনও পানি থাকায় কুয়াশার ঘনত্ব বেশি। সোমবার সকাল ৯টায় নীলফামারীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, মধ্যরাতের পর তাপমাত্রা আরো কমতে পারে বলে তিনি জানান।
নীলফামারী সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ওবায়দুল ইসলাম বলেন, রোববার রাতে রামনগর ঘাটপাড়া এলাকায় বৃদ্ধ আব্দুল গফুর শীতজনিত শ্বাসকষ্টে মারা গেছেন। ডিমলা উপজেলা টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম শাহিন বলেন, চরখড়িবাড়ি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে ময়নাল হোসেন (১২) শীতজনিত রোগে রোববার রাতে মারা গেছে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...