কুমিল্লায় ডাক্তারের বাসায় গৃহকর্মী ও স্বর্ণকারের অন্ত:স্বত্তা স্ত্রীর মৃত্যুর দায়ভার কে নিবে?

comilla
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কুমিল্লা থেকে :
সম্প্রতি কুমিল্লা শহরে ৩ দিনের ব্যবধানে ২ নারীর লোমহর্ষক মৃত্যুর বিষয় নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। ২০ ডিসেম্বর রাতে ডাঃ মিজানুর রহমানের বাসা থেকে পুলিশ উদ্ধার করে সুলতানা নামে ১৫ বছর বয়সের এক গৃহকর্মীর লাশ। ৩ দিনের মাথায় হাতের মেহেদির রং না মুছতেই শহরের বজ্রপুর এলাকায় স্বর্ণকার কানাইয়ের স্ত্রী সুমা রানী বনিক(২০)মারা যায় আগুনে পুড়ে।এ দুটি মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমটি থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হলেও সোমার মৃত্যুর বিষয়টি আপোষ মিমাংসা হয়ে যায় বলে খবর পাওয়া গেছে। নরসিংদির বেলাবো উপজেলার ঘোষলাকান্দা গ্রামের হত দরিদ্র আব্দুল মজিদ মিয়ার মেয়ে সুলতানা দু মুঠো অন্নের সংস্থানে প্রায় ২ বছর পূর্বে গৃহপরিচারিকার কাজে এসেছিলো কুমিল্লা শহরের টমসমব্রীজ এলাকায় ডাঃ মিজানুর রহমানের বাসায়। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মিজানুর রহমান কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও শহরের কুমিল্লা টাওয়ারে চেম্বার করে নিয়মিত রোগী দেখেন ও তার স্ত্রী ফারজানা সুলতানাও একজন ডাক্তার কর্মসূত্রে তিনি পিজি হাসপাতাল ঢাকায় কর্মরত। ২০ ডিসেম্বর রাতে কোতয়ালী থানা পুলিশের এসআই আকুল চন্দ্র বিশ্বাস ডাঃ মিজানুর রহমানের বাসা থেকে সুলতানার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ সুলতানার হত দরিদ্র পিতার কাছে হস্তান্তর করে।এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নং-৬৩/২০০৯।এরপর শুরু হয় নানা সমালোচনা। একাধিক স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক,সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজের মেয়ে সুলতানার মৃত্যুর বিষয়টি রহস্যজনক ও হত্যাকান্ড বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ডাঃ মিজানুর রহমান ও তার স্ত্রী ডাঃ ফারজানা সুলতানার দেয়া তথ্যমতে,কাজের মেয়ে সুলতানা খুব রাগী স্বভাবের মেয়ে ও কাজকর্মে অমনোযোগী। কিছুদিন যাবৎ সে বাড়ি যাওয়ার জন্য বলছিল।তাকে বাড়ি যেতে না দেয়ায় এবং কাজে মনোযোগী হওয়ার জন্যে বকাঝকা করলে ওইদিন বাথরুমের তোয়ালে স্ট্যান্ডে গলায় ফাসঁ লাগিয়ে আতœহত্যা করে।পরে বাথরুমের দরজা ভেঙ্গে লাশ সামনের কক্ষে এনে রাখা হয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন,বাথরুমের রয়েল প্লাগের পিন দিয়ে লাগানো সামান্য তোয়ালে ঝুলানোর স্ট্যান্ডে কিভাবে একজন মানুষ গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্নহত্যা করতে পারে একথা বোধগম্য নয়। এছাড়া নিহত মেয়েটি ও তোয়ালে ষ্ট্যান্ডের উ”চতা প্রায় সমান সমান। অপরদিকে দেশের প্রথম শ্রেণরি নাগরিক ওই ডাক্তার দম্পতিই বা কেন পুলিশ খবর না দিয়ে ফাঁসি দেয়ার স্থান থেকে লাশ নামিয়ে সামনের রুমে নিয়ে এলেন এবং বাথরুমের দরজাই কিভাবে খুললেন এসব বিষয় গুলো প্রশ্ন উঠেছে।তাছাড়া নিহতের গলায় ও পায়ে আঘাতের চিহৃ রয়েছে।আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,এত সব সিনড্রোম থাকলে কিংবা না থাকলেও পুলিশ ১৫ বছর বয়সী এ তরুণীর অকাল মৃত্যুর বিষয়টিকে অপমৃত্যু মামলায় রের্কড না করে হত্যা মামলা হিসেবে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত চালিয়ে মৃত্যুর আসল রহস্য উদঘাটন করতে পারতো। তা না হওয়ায় এখানে পুলিশের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।সূত্র জানায়,দীর্ঘ ৫ ঘন্টা সময় বাথরুমে থাকা ওই গৃহকর্মীকে বাসার লোকজন ডেকেও বের করতেও না পারলেও মৃত্যুর পর বাথরুমের দরজা অক্ষত রেখে কিভাবে লাশ বের করলো সে বিষয়টিও রহস্যজনক।
মৃত্যুর বিষয়ে ডাক্তার দম্পতির দেয়া তথ্য যদি সঠিক হয় তাহলে তাকে বকাঝকা সহ বাড়ি যেতে না দিয়ে অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করা হয় এবং আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত করা হয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশ আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত করা এ ধারায় মামলা নিতে পারতো। এর কোনটিই না করে সুলতানার মৃত্যুর বিষয়টি অপমৃত্যু মামলা হিসেবে রেকর্ড হওয়ায় মামলাটিকে হিমাগারে পাঠানো হয়েছে এবং প্রাথমিক ভাবে আসল ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। ডা. মিজানুর রহমান কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হওয়ায় তার একজন সহকর্মী কাজের মেয়ের সুলতানার ময়না তদন্তের রিপোর্ট তৈরি করবেন। এ ক্ষেত্রে বিষয়টি উলটপালটও হতে পারে বলে আশংকা করছেন অনেকে।
স্থানীয়রা জানায় ,গৃহপরিচারিকা সুলতানার উপর প্রায়ই নির্যাতন চালাতেন ডাঃ মিজানুর রহমানের স্ত্রী ডাঃ ফারজানা সুলতানা।রোববারেও তার উপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তার গলায় ও পায়ে আঘাতের চিহৃ রয়েছে।
অপরদিকে শহরের বজ্রপুর এলাকায় ২২ ডিসেম্বর গভীর রাতে স্বামীর গৃহে মারা যায় ৫ মাসের গর্ভবতী সুমা রানী বনিক(২০)।৬ মাস পূর্বে বি-বাড়িয়া জেলা শহরের পাইকপাড়া এলাকার মৃত মিলন চন্দ্র বনিকের মেয়ে সুমারানী বনিকের সাথে কুমিল্লা শহরের বজ্রপুর এলাকার বাসিন্দা ধীরেন্দ্র চন্দ্র বনিকের ছেলে ¯¦র্ণ ব্যবসায়ী কানাইয়ের সাথে বিবাহ হয়।হাতের মেহেদীর রং না মুছতেই সোমা বণিককে এ পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিতে হয়েছে।মৃত্যুর ১২ দিন পূর্বে স্বামী কানাইয়ের গৃহে শরীরে আগুন ধরে যায় গৃহবধু সোমার।স্বামী-শাশুড়ি বলছে দুধ গরম করতে গিয়ে তার শরীরে আগুন ধরে যায় গ্যাসের চুলা থেকে। অথচ এলাকাবাসী বলছে ভিন্ন কথা।গ্যাসের চুলা থেকে আগুন ধরলে সোমার সারা শরীরে কেরোসিনের গন্ধ এলো কোথেকে এবং তার গায়ে কেরোসিন দিয়ে দিলোই বা কে?আর যদি সোমা নিজেই গায়ে কেরোসিন দিয়ে শরীরে আগুন দেয় তা-ই বা কেন হলো।মৃত্যুর এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি সোমার স্বামী কানাই ও সোমার শাশুড়ী সাবিত্রি ।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়,বিবাহের ২ মাস পর থেকে সুমা ও তার শাশুড়ীর মধ্যে প্রায় ঝগড়া হতো এবং স্বামী কানাই তার মায়ের পক্ষাবলম্বন করতো।যৌতুকের জন্য তার শাশুড়ী ও স্বামী কানাই তাকে অমানুষিক নির্যাতন করতো।
মৃত্যুর ১৪/১৫ দিন পূর্বে ৫ মাসের গর্ভবতী গৃহবধু সুমারানীকে স্বামী কানাই ও শাশুড়ী সাবিত্রি ঘরের একটি কক্ষে আটক করে বাইরে থেকে ঘরের বারান্দায় তালা লাগিয়ে অন্যত্র চলে যায়। পরবর্তীতে সুমার চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এসে দেখে ঘরের ভেতরে থাকা গৃহবধূ সুমার শরীরে আগুন লেগেছে। এসময় তারা বারান্দার তালা ভেঙ্গে গৃহবধু সুমারানীকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে গৃহবধূর বুক থেকে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত আগুনে পুড়ে যায়। এদিকে সুস্থ্য না হতেই গত ২২ ডিসেম্বর গৃহবধু সুমারানীকে তার চতুর স্বামী ও শাশুড়ী হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসে। এরপর ওই রাতেই অগিদগ্ধ ৫ মাসের গর্ভবতী গৃহবধূকে শহরের জামতলা এলাকা থেকে অনভিজ্ঞ একজন ধাত্রী দিয়ে জোরপূর্বক এম,আর করা হয়। এরপর অতিরিক্ত রক্তক্ষরনে ওইদিন রাত আনুমানিক ২ টার সময় গৃহবধু সোমা মারা যায়।
স্থানীয় সাংবাদিকরাসহ এলাকার মানুষজন ঘটনাস্থলে জড়ো হলে কোতয়ালী থানা পুলিশ কানাইয়ের বাড়িতে এসে স্বামী কানাই ও শাশুড়ী সাবিত্রি বনিককে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।এরপর শুরু হয় থানামুখী দেনদরবার ।খবর পেয়ে ছুটে আসেন নিহত সোমার আতœীয়স্বজন।সূত্র জানায়,বিয়ের সময় সোমার পিতার পক্ষে দেয়া ৭ ভরি স্বর্ণলংকার ও নগদ দেড় লাখ টাকা দিয়ে সোমার মৃত্যুর বিষয়টি সামাজিকভাবে দফারফা করা হয় এবং পুলিশকে ম্যানেজ করে কানাই ও তার মাকে ছাড়িয়ে আনা হয়। নববধু সোমার অকাল মৃত্যুর রহস্যটি রয়ে যায় অন্তরালে ।লাইফ,লির্ভাটি এন্ড সিকিউরিটি একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার।নাগরিকদের এ সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হলে কিংবা কেউ কারো জীবন হানি করলে তা সামাজিকভাবে আপোষ-নিষ্পত্তির সুযোগ নেই।একমাত্র সংবিধান স্বীকৃত আইনই দিতে পারে এর সমাধান । এ ক্ষেত্রে কাজের মেয়ে সুলতানা ও গৃহবধু সোমার মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে যা হচ্ছে কিংবা হয়েছে এর দায়ভার নিবে কে? রাষ্ট্র না সংশ্লিষ্টরা?

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...