ভারত থেকে আসছে কোটি কোটি টাকার শিশুতোষ বই : দেশীয় প্রকাশকরা ক্ষুব্ধ

kidz books
কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক :
ভারতীয় শিশুতোষ বইয়ে এখন বাজার সয়লাব। শিশুদের বই ও ছড়া শেখার অন্তত চার কোটি টাকার বই প্রতি বছর আসছে ভারত থেকে। এসব বই দেশের বিভিন্ন বেসরকারি স্কুলে প্রাক প্রাথমিক পর্যায় অর্থাত্ প্লে, নার্সারি শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্ধারণ করে দেয়া হচ্ছে। মানের দিক থেকে ভারতীয় বই ভালো বিবেচনা করে অনেক অভিভাবকও এসব বই কিনছেন। অথচ দেশের প্রায় দেড়শ’ প্রকাশনী উন্নতমানের শিশুতোষ বই প্রকাশ করছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকার ফলেই ভারতীয় শিশুতোষ বই আসছে। এ নিয়ে দেশের প্রকাশকরা ক্ষুব্ধ। তারা জানান, ভারতীয় শিশুতোষ বই থেকে শিশুরা সে দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠছে।
বইয়ের পাইকারি বাজার সরেজমিন ঘুরে ও শিশুতোষ বই বের করেন এমন কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকেই শিশুদের জন্য বর্ণ শেখার বই ভারত থেকে আসতে শুরু করে। শিশুদের বর্ণ শেখার উপযোগী কোনো বই না থাকায় এদেশের কয়েকজন প্রকাশক সে সময় এসব বই ভারত থেকে আমদানি শুরু করেন। ভাষাগত মিল থাকায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেই বইগুলো আনা হয়। পরে আশির দশক থেকে বাংলাদেশে দিগন্ত, শরীফ, উইনারের মতো পাঁচ-ছয়টি প্রকাশনা সংস্থা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশেই শিশুদের বর্ণ পরিচয় ও ছড়ার বই প্রকাশ করতে শুরু করে। এখন ব্র্যাক, ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন, আহছানিয়া মিশনের মতো বেশ কয়েকটি এনজিও এসব বই বের করছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ১৫০টি প্রকাশনী সংস্থা শিশুদের জন্য বর্ণ, ছড়া ও ফুল, ফল, জীবজন্তুসহ দেশীয় নানা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য শেখানোর বই প্রকাশ করছে। কিছু স্কুলও দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডসহ (ইউপিএল) বেশ কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের শিশুতোষ বইগুলো পাঠ্য করছে। দেশি প্রকাশনীর বইগুলোর দামও তূলনামূলক কম। ভারতের কলকাতার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শিশু সাহিত্য সংসদ প্রাইভেট লিমিটেডের ‘সংসদ বর্ণলিপি-১’ বাংলা বইটি নীলক্ষেতের বইয়ের বাজার থেকে কিনতে হয় ৬০ টাকায়। অথচ বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রকাশনীরই বাংলা বর্ণ শেখার বইগুলোর দাম ১০ থেকে ২৫ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তবে দেশে উত্পাদনের ব্যবস্থা না থাকায় এসব শিশুতোষ বইয়ের মূল কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে। কোরিয়ার আর্ট পেপারে ছাপানো হচ্ছে এসব বই। বই লেমিনেশনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে চীন থেকে আমদানি করা ফিল্ম। ছাপার মেশিনগুলোও ব্যক্তিগত উদ্যোগে উন্নত করেছেন প্রকাশকরা।
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির এক কর্মকর্তা জানান, শুধু পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড আমদানি করে প্রায় ৭৫ লাখ টাকার বই। এই প্রতিষ্ঠানটি কলকাতার শিশু সাহিত্য সংসদ প্রাইভেট লিমিটেডের বাংলাদেশে একমাত্র এজেন্ট।
তবে শিশুতোষ বই প্রকাশকদের দাবি, এখনও ভারত থেকে বছরে এক কোটি বর্ণ ও ছড়া শেখার শিশুতোষ বই আমদানি করা হয়। যার আর্থিক মূল্য চার কোটি টাকা।
শিশুদের বই প্রকাশ করা শাহ আলী (রহ.) লাইব্রেরির মালিক আমজাদ হোসেন বলেন, দেশে প্রকাশিত শিশুদের বর্ণ পরিচয়ের বইগুলো এখন অনেক উন্নত হয়েছে। ভারতীয় বই আমদানির কোনো প্রয়োজনই এখন নেই। কারণ ভারত থেকে আসা বইগুলোতে সে দেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশ পায়। আর বাংলাদেশে প্রকাশিত বইগুলোতে এদেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে।
একই কথা বলেন শিশু সাহিত্য সেন্টারের উত্পাদন ও মার্কেটিং ম্যানেজার মোঃ ইমরান ভুঁইয়া ও গাজী প্রকাশনীর মালিক গাজী মোহাম্মদ শহীদ। গাজী মোহাম্মদ শহীদ বলেন, অনেক কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকের মধ্যে বিদেশি জিনিস মানেই ভালো, এমন ধারণা থাকায় অনেক উন্নতমানের হওয়া সত্ত্বেও তারা দেশি বইগুলো শিশুদের হাতে দেন না। অথচ বিদেশি বই পড়ে দেশি সংস্কৃতির বদলে বিদেশি সংস্কৃতিই শিখছে শিশুরা। তবে দেশে প্রকাশিত কিছু প্রকাশনীর বইয়ে কিছুটা দুর্বলতা এখনও রয়েছে। সরকার নির্দিষ্ট কারিকুলাম ও নিয়মনীতি নির্ধারণ করে দিলে এ দুর্বলতা থাকতো না বলে জানান তিনি।
মোঃ ইমরান ভুঁইয়া বলেন, দেশের প্রায় সব স্কুলেই শিক্ষকদের ডোনেশন না দিলে কোন প্রকাশনীর বই ছাত্রদের জন্য পাঠ্য করা হয় না। সেটা যত ভালো মানেরই হোক না কেন। এটাই এখন নিয়ম হয়ে গেছে। আমরা পাইকারিভাবে বইপ্রতি সাড়ে সাত টাকা করে বিক্রি করি। শিক্ষকরা প্রতি বইয়ের জন্য কমপক্ষে ১০ টাকা করে ডোনেশন চান। এতে বইয়ের খরচ পড়ে যায় ১৭ টাকার বেশি। বইয়ের উত্পাদন খরচ ও শিক্ষদের ডোনেশন দিয়ে লাভ করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশ ও ভারতের কয়েকটি বাংলা বর্ণ শেখার বই পড়ে দেখা যায়, ভারতের বইগুলোতে থাকে ঠ-তে ঠাকুর, ম-তে মন্দির, ঋ-তে ঋষি ইত্যাদি। আর বাংলাদেশের বইতে সেগুলো করা হয়েছে ক-তে কুরআন, ঠ-তে ঠেলাগাড়ি, ম-তে মসজিদ, খ-তে খলিফা, ঋ-তে ঋতু ইত্যাদি। শব্দের শেষে বাংলাদেশের ভাষায় ‘নে’, ‘কো’ ‘গো’ এসব অনুসর্গ ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু ভারতে এগুলো আছে। ভারতের কলকাতার প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান শিশু সাহিত্য সংসদ প্রাইভেট লিমিটেডের ‘সংসদ ছড়া ও ছবি ১’ বইটির বিভিন্ন ছড়ায় ‘পড়িসনেকো’, ‘যাওগো’, ‘উড়িস নে’, ‘ছুড়িসনে’, ‘জানিস নে’, ‘চুড়ো’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার আছে।
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডের কর্ণধার কামরুল হাসান শায়ক বলেন, শিক্ষা সংস্কৃতির মূল উপকরণ বই। অথচ সেই বই প্রকাশনায় বাংলাদেশ সরকারের কোনো সুপ্রসারিত ভাবনা নেই। প্রকাশনা ক্ষেত্রটিতে উন্নয়নের কোনো চিন্তা নেই। শিশুতোষ বইয়ের বিষয়ে নীতিমালা বা পৃষ্ঠপোষকতা কিছুই নেই। যার কারণে এদেশে প্রকাশনা এখনও শিল্প হয়ে উঠতে পারেনি। এজন্য সরকারের এখনই যথাযথ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এছাড়া শিক্ষকদের বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে বিবেকবান ও অভিভাবকদের সচেতন হওয়া দরকার।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...