বাংলাদেশের ৩৩ বছরের ক্রিকেট ইতিহাস

cricket 2
কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক :
ক্রিকেট এখন বাংলাদেশের এক নম্বর খেলা। কিন্তু কিছুদিন আগেও সে অবস্থা ছিল না। ঐতিহ্যগতভাবে ফুটবলই ছিল এ অঞ্চলের প্রধান খেলা। স্বাধীনতার পূর্বে পশ্চিম পাকিস্তানিরা সবকিছুর মতো ক্রিকেটেও চালিয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। চবিবশ বছরে মাত্র একজন বাঙালি পাকিস্তান জাতীয় দলের দ্বাদশ খেলোয়াড় হবার সুযোগ পেয়েছিল। সে সময় ততকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ক্রিকেটামোদীরা ঢাকা স্টেডিয়ামে টেস্ট ম্যাচ দেখেছে ঠিকই কিন্তু স্বজাতীয় কোন খেলোয়াড়কে দেখেনি ওয়েসলি হলের বল মোকাবেলা করতে; দেখেনি কোন বাঙালি বোলারকে রোহান কানহাইয়ের উদ্দেশে বল করতে।
ঢাকা স্টেডিয়ামের সবুজ প্রান্তর মুখরিত হয়েছে বহু টেস্ট ক্রিকেটারের পদচারণায়। তারপরও এ অঞ্চলের ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয় তৃষার্তই রয়ে গেছে। নিজের মাঠে দেখতে হয়েছে ভিন দেশীদের নৈপুণ্য। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। এখন বাংলাদেশের মাটিতে টেস্ট ম্যাচ হলে এর একটি দল বাংলাদেশ। দু’টি বিদেশী দলের খেলোয়াড়দের ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিংই নয়, এদেশের মাশরাফি-রুবেল, সাকিব-তামিমদের নৈপুণ্যেও উদ্বেলিত হওয়ার দিন এসেছে।
টেস্ট খেলুড়ে দেশের একটি এখন বাংলাদেশ। ত্রিশ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের ক্রিকেটের এ সাফল্যকে খাট করে দেখার কোনো উপায় নেই। তবে এ পর্যায়ে আসতে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি আমাদের ক্রিকেটকে। স্বাধীনতার পূর্বে বাংলাদেশ ছিল টেস্ট প্লেয়িং একটি দেশের একটি অংশ। বৈষম্য থাকার পরও ক্রিকেটের টেস্ট খেলুড়ে একটি দেশের সাংগঠনিক কার্যক্রমের ছোঁয়া পাওয়া গেছে। ১৯৭২ সালে ইউসুফ আলী ও মোজাফফর হোসেন খানকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে বাংলাদেশী ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড গঠিত হয়। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এর সাথে অনেকটা সংশ্রবহীন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। বেশ ক’বছর এভাবে কাটার পর একজন বন্ধুর দেখা পায় বাংলাদেশ। এ সময় বাংলাদেশ সফরে আসেন রবিন মারলার নামক এক ব্রিটিশ সাংবাদিক। পাকিস্তান আমলে তিনি এখানে ঢাকা এসেছেন টেস্ট ম্যাচ কভার করতে। তখন দেখেছেন এখানেও ক্রিকেটের মাঠ আছে। ক্রিকেটের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আছে। স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকা এসে দেখলেন, ক্রিকেট এখানে প্রায় অতীত হয়ে যাওয়া একটি শব্দ। যে দেশটি এক সময় একটি টেস্ট খেলুড়ে দেশের অংশ ছিল সে দেশে ক্রিকেটের এ দৈন্যদশা অত্যন্ত পীড়া দিল রবিন মারলারকে। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই প্রথম এমসিসি দল বাংলাদেশে খেলতে আসে। বিদেশী দলের ঢাকা আগমনের এ ধারা এরপর থেকে আর থেমে থাকেনি। সে বছরই অর্থাত ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ আইসিসির সহযোগী সদস্যপদ লাভ করে। এরপর একে একে বিভিন্ন দল আসতে থাকে এদেশে প্রীতি ম্যাচ খেলার জন্য। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলও বিদেশ সফর শুরু করে।
১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশ নিয়মিত আইসিসি ট্রফিতে অংশ নিতে থাকে। প্রতিবেশী তিন টেস্ট দল ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার টেস্ট খেলোয়াড়রাও নিয়মিত বিরতিতে ঢাকার মাঠে আসা শুরু করে প্রীতি বা প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নিতে। কিন্তু এতো কিছুর পরও ফুটবলকে ডিঙিয়ে দেশের প্রধান খেলা হতে সক্ষম হয়নি ক্রিকেট।
১৯৮৮ সালে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরগরম হয়ে ওঠে টেস্ট দলগুলোর পদচারণায়। তৃতীয় এশিয়া কাপ ক্রিকেটে সেবার ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার সাথে বাংলাদেশও অংশ নেয়। পরের বছর জুনিয়র এশিয়া কাপও অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার মাঠে। তবুও যেন লিপু, আতাহার আলী, নান্নুদের থেকে ফুটবলার কায়সার হামিদ, আসলাম, জনীরা বেশি জনপ্রিয় ছিল ক্রীড়ামোদীদের কাছে। তবে এটা ঠিক, জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে ফুটবল ও ক্রিকেটের পার্থক্য তখন বেশ কমে আসে।
এর কয়েক বছর পরই এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয় ১৯৯২ সালে। সেবার বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলা সরাসরি দেখার সুযোগ পায় এদেশের দর্শকরা। ক্রীড়ামোদীদের দারুণভাবে নাড়া দেয় বিশবকাপ। পাশাপাশি আরেকটি ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেট নতুন দিগন্তে প্রবেশের উন্মোচন করে দেয়। জিম্বাবুয়েকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) পূর্ণ সদস্যপদ বা টেস্ট স্ট্যাটাস দিয়ে দেয় এবং সিদ্ধান্ত হয় পরবর্তী বিশ্বকাপে আইসিসি ট্রফির শীর্ষ তিন দল খেলার সুযোগ পাবে বিশবকাপে। তিনবারের আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন জিম্বাবুয়ের কাছে দু’বার সেমি ফাইনালে হেরেছে বাংলাদেশ। সুতরাং জিম্বাবুয়ের অবর্তমানে বাংলাদেশ ফেভারিট দল আইসিসি ট্রফি ক্রিকেটে। দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা স্বপ্ন দেখতে থাকে বিশবকাপ ক্রিকেট খেলার। কোন ডিসিপ্লিনে বিশবকাপ খেলার সম্ভাবনা এই প্রথম। তাই দেশবাসীর মধ্যে দারুণ সাড়া পড়ে যায়। বাংলাদেশে ক্রিকেট এর জনপ্রিয়তা উধ্বর্মুখি হয়ে ওঠে।
১৯৯৪ সালে কেনিয়াতে অনুষ্ঠিত হয় আইসিসি ট্রফি। বাংলাদেশ অংশ নেয় ট্রফি জয়ে হট ফেভারিট হিসেবে। কিন্তু স্বপ্ন পুরণ হয় না বাংলাদেশের। সবচেয়ে গুরুতপূর্ণ ম্যাচে অল্প ব্যবধানে কেনিয়ার কাছে হেরে হৃদয় ভেঙ্গে দেয় দেশবাসীর। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে খেলা হয় না বাংলাদেশের। আবার অপেক্ষা তিন বছরের জন্য। ১৯৯৭ সালে আকরাম খানের নেতৃত্বে যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আইসিসি ট্রফিতে অংশ নিতে মালয়েশিয়া রওনা হয় তখন তাদের সাথে ছিল দুটি প্রধান অস্ত্র। প্রথমতঃ এদেশের কোটি ক্রীড়ামোদীর অন্তঃস্থল থেকে বেরিয়ে আসা প্রার্থনা। দ্বিতীয়তঃ গর্ডন গ্রিনিজের মতো একজন উঁচুমানের নিষ্ঠাবান কোচ। খেলোয়াড়দের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেন গ্রীনিজ। গ্রুপ ম্যাচে অবিশ্বাস্যভাবে অধিনায়ক আকরাম খান হল্যান্ডের হাতের মুঠো থেকে জয় ছিনিয়ে আনেন। এরপর স্কটল্যান্ডকে সহজেই সেমিফাইনালে হারিয়ে স্বপ্নের বিশবকাপে খেলার ছাড়পত্র পায়। সারা দেশে বাধভাঙ্গা আনন্দে ভেসে যায়। দলমত নির্বিশেষে সবাই হাতে হাত ধরে উল্লাসে মেতে ওঠে।
inline
শুধু বিশবকাপে কোয়ালিফাই করে মন ভরেনি আকরাম বাহিনীর। তীব্র প্রতিদ্বনিদ্বতাপূর্ণ ফাইনালে তারা হারিয়ে দেয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী কেনিয়াকে। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই তারা অংশ নেয় ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশবকাপে। এরপরের ইতিহাস সবার জানা। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে প্রতিযোগিতার রানার্সআপ পাকিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা উপহার দেয় প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় চমক। ব্যাস! কাজ যা হবার হয়ে যায়। মাঠের সাফল্যের সাথে যুক্ত হয় সফল ক্রিকেট কূটনীতির এবং নতুন শতাব্দীর শুরুতেই বাংলাদেশে লাল-সবুজ পতাকা ক্রিকেটের এলিট শ্রেণী অর্থাৎ টেস্ট দলসমূহের দশম সদস্য হিসেবে নিজের স্থান করে নেয়। ক্রিকেট কূটনীতির এ সাফল্যে দু’জন ব্যক্তির অবদান ছিল অনস্বীকার্য। এর একজন হলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী ও বর্তমানে এশিয়ান ক্রিকেট কাউনিল (এসিসি) এর প্রধান নির্বাহী সৈয়দ আশরাফুল হক।
২০০০ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ খেলে ঐতিহাসিক অভিষেক টেস্ট। ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের প্রশংসা আদায় করে নেয়। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ৪০০ রান করে। আমিনুল ইসলাম বুলবুল করেন ১৪৫। ইতিহাসের অংশ হয়ে যান আমিনুল দেশের অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরী করে। হাবিবুল বাশার সুমন করেন বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম হাফ সেঞ্চুরী। টেস্ট হেরে যায় বাংলাদেশ ৮ উইকেটে। তবে আশাবাদী হওয়ার মত সম্ভাবনা জাগায় তারা। কিন্তু এই সম্ভাবনা বাংলাদেশ বাস্তবে পরিণত করতে পারেনি। একের পর শোচনীয় হার বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাসকেই করে তুলেছে প্রশ্নের সম্মুখীন। তবে এর মাঝেও বাংলাদেশ কিছু ব্যাক্তিগত নৈপুণ্যে আলো ছড়িয়েছে। অভিষেক টেস্টে আমিনুল সেঞ্চুরী করেছেন। নাঈমুর রহমান নিয়েছেন ৬ উইকেট। জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে জাভেদ ওমর ক্যারিয়িং ব্যাট থ্রু আউট দ্য ইনিংস এর কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় কীতিটি গড়েছেন কিশোর আশরাফুল। টেস্ট ক্রিকেটে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান এর রেকর্ডটি নিজের করে নিয়েছেন ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে। শ্রীঙ্ককার বিরুদ্ধে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপে মুরলিধরন-চামিন্দা ভাসকে মোকাবেলা করে ১১৪ রান করে সোয়াশ’ বছরের টেষ্ট ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরী করার কৃতিত্ব অর্জন করেন।
cricket 1
ব্যক্তিগত গুটিকয় অর্জন বাদ দিলে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার দু’বছরে কোন টেস্ট ম্যাচকে চতুর্থ দিনেই নিয়ে যেতে পেরেছে মাত্র বার কয়েক। তবে লড়াই করার খ্যাতি আছে বাংলাদেশের। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে দেশের (শহীদ মুশতাক ও জুয়েল) মত ক্রিকেটাররা প্রাণ দেয় সে দেশের বীর ক্রিকেটাররা এই দুরবস্থাও একদিন জয় করবেই। এই অত্মবিশ্বাসে দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ে এবং চলতি বছরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে তাদের হোইট ওয়াশ করে বিশ্ববাসিকে জানিয়ে দেয় ‘তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’। ইংল্যান্ড ব্যথিত বিশ্বের সব দেশ বাংলাদের সাথে হারের স্বাধ পেয়েছে।
cricket 3
ক্রিকেটের ৩৩ বছর অতিক্রম করে নতুন দিনের সূর্য দেখতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। সাবিক আল হাসানের হাত ধরে জাতি পেয়েছে হ্যাট্রিক সিরোপা জয়ের স্বাদ। নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা পুরো সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরেছে। এই আত্মবিশ্বাসের সাথে পুরো জাতি এবার আশা করতেই পারে নিজেদের মাটিতে ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ডকে হারিয়ে জয়ের ষোলকলা পরিপূর্ণ করবে টাইগার বাহিনী।

Check Also

কুমিল্লার বিপক্ষে ১৫৩ রানের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে রাজশাহী

ক্রীড়া প্রতিবেদক :– বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ক্রিকেটে রাজশাহী কিংসকে ১৫৩ রানের টার্গেট দিলো কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। ...