বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যদিয়ে ৪ ডিসেম্বর দেবিদ্বার মুক্ত দিবস উদযাপিত

মোঃ ফখরুল ইসলাম সাগর :দেবিদ্বার প্রতিনিধি:
৪ ডিসেম্বর দেবিদ্বার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ এর সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে ধাপে ধাপে পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চল, তারই ধারাবাহিকতায় ৪ ডিসেম্বর দেবিদ্বার থানা এলাকা হানাদারমুক্ত হয়েছিল। বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যদিয়ে দিবসটি উদযাপন করে দেবিদ্বার উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। সকালে উপজেলা চেয়ারম্যান রাজী মোহাম্মদ ফখরুল মুন্সীর নেতৃত্বে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সদরে একটি বিশাল র‌্যালী বের করা হয়। র‌্যালীতে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মামুনুর রশীদ ভূইয়া, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান একেএম সফিকুল আলম কামাল, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট নাজমা বেগম, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ গোলাম কবির, দেবিদ্বার থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ জাহেদুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব জয়নুল আবেদীন, পৌর সচিব মোঃ সহিদুল ইসলাম, দেবিদ্বার প্রেস ক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আবুল কাশেম ওমানী, মুক্তিযোদ্ধা আবদুস ছামাদ, রফিকুল ইসলাম, উপজেলা কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, কুমিল্লাওয়েব এর সম্পাদক মোঃ আক্তার হোসেন, সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সাইফুদ্দিন রনি প্রমুখ। পরে উপজেলা সদরে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সংলগ্ন গণকবরে পুস্পস্তবক অর্পণ করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাকে সাড়া দিয়ে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সারাদেশে ন্যায় দেবিদ্বার ছাত্র, যুবক, আবাল, বৃদ্ধ বনিতা। দেবিদ্বার উপজেলার কমবেশি প্রায় সব গ্রামই তিগ্রস্ত হয়েছিল পাক হানাদারদের নৃশংস বর্বরতায়।
স্বাধীনতা ঘোষনার মাত্র ৫ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ৩১ মার্চ কুমিল্লা সিলেট মহাসড়কে বি-বাড়িয়া থেকে কুমিল্লা, সেনানিবাসে (তৎকালীণ পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাঊনি) পায়ে হেঁটে গমনকারী আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত ১৫ জনের একটি হানাদার দল কাক ডাকা ভোরে দেবিদ্বার ভিংলাবাড়ি নামক স্থানে জনতা কর্তৃক প্রথম অবরুদ্ধ হয়।
এ যুদ্ধে বারেরা গ্রামের কৃষক সৈয়দ আলী, আঃ মজিদ, চরবাকর গ্রামের মমতাজ বেগম, নায়েব আলী, সফর আলী, সাদত আলী, লাল মিয়া, ঝারু মিয়া, বাজেবাকর গ্রামের আঃ মালেক, খলিলপুর গ্রামের ১ অজ্ঞাত ১ জন ফুলতলী গ্রামের ছফর আলী, ফরিদ মিয়াসহ ৩৩ বাঙ্গালি শহীদ হন। প্রথম শহীদ হয়েছিলেন চম্পকনগর গ্রামের আবুল কাশেম।
৬ সেপ্টেম্বর পাকহানাদারের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে বারুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মোঃ জয়নাল আবেদীন,বাচ্চু মিয়া, শহিদুল ইসলাম, আলী মিয়া, আঃ ছালাম, সফিকুল ইসলাম, মোঃ হোসেনসহ ৭ জন শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদারের বর্বরতার নির্মম স্বার দেবিদ্বারের অবহেলিত ‘গণকবর’। ১৭ সেপ্টেম্বর শক্র সেনারা মুরাদনগরের রামচন্দ্রপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০ বাঙালিকে ধরে এনে দেবিদ্বার উপজেলা সদরের প্রাথমিক শিক সমিতির সামনে গর্ত খুড়ে সাড়িবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ সময় ভাগ্যক্রমে একজন বেঁচে গেলেও বাকি ১৯ শহীদকে ওই কবরে মাটি চাপা দেওয়া হয়। এদিনে ১৪ আশ্বিন বাংলা (২৯ নভেম্বর সম্ভব্য) ধামতী ও ভূষনা গ্রামের ১৬টি বাড়ি ও ৬টি নিরীহ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে ওই কবরগুলো এখনো অবহেলা অনাদরে পড়ে আছে এবং ধামতি গ্রামের বিখ্যাত চৌধুরী বাড়িসহ ৯০টি বাড়ি জ্বালানোর পর ধামতী আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আজিম উদ্দিন পীর সাহেবের নাতি সহিদউল্লাহ, অধ্য হালিম হুজুরের ভাগ্নে জোহর আলী ও আঃ বারির সহোদর তাজুল ইসলাম এবং নজরুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে। দেবিদ্বার পোনরা গ্রামে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা (নরসিংদী জেলার) শহীদ আবুবকর, ভিরাল্লা গ্রামের শহীদ মুজিবর রহমান খানের কবর ও পথিকের হৃদয় আলোড়িত করে অশ্র“সজল করে। রাজামেহার এলাকায় রাস্তার দু পাশে প্রায় ৩ কিঃ মিঃ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। স্বাধীনাত সংগ্রামে দেবিদ্বারবাসীর অবদান ছিল প্রশংসনীয়। মুক্তিযোদ্ধা চলাকালীন সময়ে প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা মন্ডলীর বর্তমান একমাত্র জীবিত সদস্য ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ। ন্যাপ, সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরীলা বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কমরেড মরহুম আঃ হাফেজ, পালাটোনা ক্যাম্প প্রধান যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক এমপি মরহুম ক্যাপটেন সুজাত আলী, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক আজগর হোসেন মাষ্টার, মরহুম আব্দুল আজিজ খান, দেবিদ্বার কলাবাড়িয়া গ্রামের মরহুম ওস্তাদ সাদিম আলী, শহীদ নজরুল ইসলাম, শেখ আলমসহ অসংখ্য সংগ্রামী ও ত্যাগী যোদ্ধার জন্মস্থান দেবিদ্বার।
৩ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর ও মিত্রবাহিনীর যৌথভাবে হানাদারের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা করে। মুক্তিবাহিনী কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের কোম্পানীগঞ্জ ব্রীজটি মাইন বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়। মিত্র বাহিনীর ২৩ মাউন্টেড ডিভিশনের মেজর জেনারেল আর.ডি বিহারের নেতৃত্বে বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলে এ অভিযান পরিচালিত হয়। মিত্রবাহিনীর একটি ট্যাংক বহর বুড়িচং ব্রাণপাড়া হয়ে দেবিদ্বার আসে। হানাদাররা এ রাতে দেবিদ্বার ছেড়ে কুমিল্লা সেনানিবাসে পালিয়ে যায়। ধীরে ধীরে মুক্তিবাহিনীর গ্র“প সেনা সদরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এরই মধ্যে মিত্র বাহিনীর ট্যাংক বহরটি দেবিদ্বার থেকে চান্দিনা রোডে ঢাকা অভিমুখে রওয়ানা হলে মোহনপুর এলাকায় ভুল বুঝাবুঝির কারণে দু মিত্র গ্র“পে গুলি বিনিময়ে ৬ মিত্র সদস্য নিহত হয়। ৪ ডিসেম্বর দেবিদ্বারে উল্লাসিত জনতা স্বাধীন বাংলার লাল সবুজ পতাকা নিয়ে বিজয়ের আনন্দে মেতে উঠেন।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...