ভোলার লালমোহনে লঞ্চডুবি: ৭২ ঘণ্টায় ৭৮ লাশ উদ্ধার: নিখোঁজ শতাধিক

বিশেষ প্রতিনিধি:
পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দে শামিল হতে গিয়ে লাশ হয়ে ঘরে ফিরলেন ৭৮ জন। নিখোঁজ রয়েছেন একশ জন। ঈদের আনন্দের পরিবর্তে স্বজন হারাদের কান্নায় ভারী হয়ে আছে ভোলার লালমোহনের বাতাস। ডুবে যাওয়ার ৭২ ঘণ্টা পরও এমভি কোকো উদ্ধার করা যায়নি। উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা সর্বাত্মক চেষ্টার পর সোমবার দুপুরে কাত হয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চ কোকোকে সোজা করতে পেরেছে মাত্র। হামজার পক্ষে এর বেশি আর কিছু করা সম্ভব নয়। কারণ হামজার ক্ষমতা ৫০ টন আর কোকোর ওজন ৬০০ টন। এ ওজনের লঞ্চ উদ্ধারের ক্ষমতা আছে উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তমের। কিন্তু নাব্যতা সঙ্কটে রুস্তমকে এখানে আনা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় অবশিষ্ট লাশের সন্ধানে ডুবুরি আর স্থানীয় জনতার তৎপরতাই শেষ ভরসা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৭৮টি লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। উদ্ধারকৃত লাশের অধিকাংশই শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, লঞ্চে আরো ৪০-৫০ জনের লাশ আটকে আছে। এ লাশের আশায় নদীর ঘাটে ভিড় করে আছে নিখোঁজদের স্বজনরা। লাশ ওঠা মাত্র তারা পাগল-পারা হয়ে ভির করছে দেখার জন্য। ঈদের আগের দিন শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টায় ভোলার লালমোহনে নাজিরপুর ঘাটে এ লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে। রাতে দুর্ঘটনা ঘটলেও উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয় পরদিন শনিবার দুপুরে বরিশাল থেকে নৌ ফায়ার সার্ভিসের তিন ডুবুরি আসার পর। এরও অনেক পরে রোববার দুপুরে আসে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা। অবশ্য দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় জনগণ উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। এ উদ্ধার তৎপরতায় লঞ্চে আটকে থাকা অনেকের জীবন রক্ষা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের উদ্ধার তৎপরতায় বিলম্ব নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। উদ্ধারকাজে বিলম্ব হওয়ায় উত্তেজিত জনতার তোপের মুখে পড়ে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজাসহ প্রশাসনের লোকজন। দুর্ঘটনার ৩৭ ঘণ্টা পর হামজা নাজিরপুর এসে উদ্ধারকাজ শুরু করলেও জীবিত কাউকে উদ্ধার করতে পারেনি। রোববার সকাল ১১টায় ঘটনাস্থলে পৌঁছার পর দুপুর সোয়া ১টায় লঞ্চটি টেনে সোজা করে। পুরোপুরি টেনে তুলতে না পারায় জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে হামজা কর্তৃপক্ষ ব্যর্থতা প্রকাশ করায় জনগণ জুতা, ইট ও কাদা ছুড়তে থাকে উদ্ধারকারীদের প্রতি। স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়, দিনের মধ্যে লঞ্চ না ওঠালে রাতে লাশ উঠিয়ে পেট কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেবে। পরে এমপি মেজর জসিম, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করেন। এ সময় পুলিশ সদস্য লিটন চন্দ্র হাওলাদারসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। বিআইডাব্লিউটিএর চেয়ারম্যান আ. মালেক মিয়া জানান, হামজার ধারণক্ষমতা ৬০ টন। কিন্তু ডুবে যাওয়া কোকো-৪ লঞ্চের ওজন ৫০০ টন। এ কারণে পুরোপুরি লঞ্চটিকে উত্তোলন করা সম্ভব নয়। তেঁতুলিয়া নদীর গভীরতা কম হওয়ায় শনিবার সকালে রওনা দিয়ে রোববার সকালে এসে পৌঁছে। তিনি আরো জানান, পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছে। এমভি কোকোর দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি পুনর্গঠিত করা হয়েছে। সোমবর রাতে নৌ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাত সদস্যের পুনর্গঠিত কমিটির আহ্বায়ক হলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম প্রধান জয়ন্ত কুমার নন্দী। অপর সদস্যরা হলেন- নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহম্মদ বায়তুল আমিন ভূইয়া, বিআইডাব্লিউটিসির জেনারেল ম্যানেজার ক্যাপ্টেন শওকত সরদার, বিআইডাব্লিইটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. আবদুল হাই বিআইডাব্লিইটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম, লালমোহন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বাবর আলী মীর এবং সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর মো. শফিকুর রহমান। আগামী সাতদিনের মধ্যে এ কমিটি রিপোর্ট দেবে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...