মুরাদনগরের উত্তরাঞ্চলের জনগনের মনে প্রণচাঞ্চল্যতা আইন-শৃংখলার উন্নয়নে অচিরেই হতে যাচ্ছে নতুন থানা

মোঃ হাবিবুর রহমান (মুরাদনগর) : চট্টগ্রাম বিভাগের সর্ববৃহৎ কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলাটি ভেঙ্গে উত্তরাঞ্চলের ৮/৯টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে চাপিতলা, বাঙ্গরা অথবা দীঘির পাড় এলাকায় নতুন থানা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যদিও যাত্রাপুর ইউনিয়নের জনগণ প্রস্তাবিত নতুন থানায় যেতে আগ্রহী নয়। তবুও বাকী ৯টি ইউনিয়নের সর্বসাধারণ এখন নতুন প্রস্তাবিত থানা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে আসছে। ইতিমধ্যে প্রস্তাবিত নতুন থানা এলাকাটি রাষ্ট্রপতি ও প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশ মতে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোঃ আব্দুল মালেক ও পুলিশ সুপার সফিকুল ইসলামসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ সরেজমিন পরিদর্শনও করেছেন। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবিত নতুন থানাটি উপজেলার চাপিতলা-বাঙ্গরা নাকি দীঘির পাড় স্থাপিত হবে তা’নিয়ে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। অধীর আগ্রহে ওই সব এলাকার মানুষ অপেক্ষার প্রহর গুণছে। থানা স্থপন করার উদ্যোগ নিয়ে চাপিতলা, বাঙ্গরা ও দীঘির পাড়কে কেন্দ্র করে এলাকার সুধীজন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জোর তদবীর এবং লবিং চালাচ্ছেন। অনেকের ধারনা, তদবীরের খুঁটির জোরের উপর নির্ভর করবে প্রস্তাবিত নতুন থানাটি কোন গ্রামে স্থাপিত হবে। জনগণের সুবিধার্থে ভাগ্য বিড়ম্বিত এলাকার লোকজন অপেক্ষা করতে যাচ্ছে, কোথায় হবে তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ও বহুল আলোচিত নতুন থানা। যা’ বার বার তাদেরকে তাড়া করছে।
প্রসঙ্গত কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) নির্বাচনী এলাকাটি ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। ২০০১ সালের আদমশুমারীর গণনা অনুসারে মুরাদনগরে প্রায় ৫লাখ লোকের বসবাস। বর্তমানে যা’ ৭ লাখেরও বেশী। এ ছাড়া ভৌগলিক কারণেও চট্টগ্রাম বিভাগের সর্ববৃহৎ হিসেবে মুরাদনগর উপজেলাটি পরিচিত। এখানে গোমতী-তিতাস নদী ও অদের খালের আঁকা-বাঁকা গতিপথ, হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল, নদী-নালা, সমন্বয়ে ৪টি ছোট-বড় অঞ্চলে বিভক্ত। তারই একটি হলো-রুপবাবু বাজার বলে খ্যাত বাঙ্গরা, স্বাধীনতার যুদ্ধে রণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত চাপিতলা ও প্রসিদ্ধ গ্রাম হিসেবে দীঘিরপাড়। এ ৩টি এলাকাই ৮/৯টি ইউনিয়নে বিন্যস্ত। অথচ অজপাড়াগাঁ আন্দিকোট ইউনিয়নের সিদ্ধেশ্বরীতে একটি পুলিশ ফাঁড়ি দীর্ঘদিন যাবত বিদ্যমান থাকলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ওই এলাকার জনগণের কোন উপকারে আসছে না। তাই স্থানীয় অধিবাসীদের সামাজিক-ভৌগলিক ও সার্বিক দিক বিবেচনা করে এবং সুষ্ঠুভাবে আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণকল্পে মুরাদনগর উপজেলার উত্তরাঞ্চলের চাপিতলা গ্রামেই প্রস্তাবিত থানার যৌক্তিকতা রয়েছে বলে সুশীল সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা অভিমত দিয়েছেন। সূত্র জানায়, নতুন প্রস্তাবিত থানা বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নতুন থানা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক কুমিল্লার মতামত নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
দেশে নতুন থানা স্থাপনের জন্য যেসব শর্তাবলী ও ণীতি-পদ্ধতি রয়েছে, সেখানে নতুন থানা করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। চাপিতলা ও বাঙ্গরা কিংবা দীঘির পাড় গ্রামে প্রস্তাবিত নতুন থানা স্থাপনের ক্ষেত্রে অপরাধ প্রবণতাসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার
অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক বাঁধা, জেলা ও উপজেলা সদর হতে দূরত্ব এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
নীতিমালায় রয়েছে, পল্লী এলাকায় নতুন থানা স্থাপনের ক্ষেত্রে সাধারণত ইউনিয়ন সংখ্যা পৌরসভা থাকলে ন্যূণতম ৭টি এবং পৌরসভা না থাকলে ন্যূণতম ৮টি, জনসংখ্যা দুই থেকে আড়াই লাখ এবং আয়তন ন্যূণতম ২৫০ বর্গ কিলোমিটার হতে হবে। তবে পার্বত্য এলাকা, দ্বীপ এলাকা, সমুদ্র উপকূলীয় চর এলাকা, নিম্নাঞ্চলীয় হাওড় ও সুন্দরবন এলাকার ভৌগোলিক আয়তন সংক্রান্ত শর্ত, এসব এলাকার ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত সংখ্যায়ও পরিমানে শিথিলযোগ্য বলে গণ্য হতে পারে।
এ ব্যাপারে চাপিতলা গ্রামের গণ-পরিষদের সাবেক সদস্য, বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব হাজী আবুল হাশেম জানান, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের প্রয়াত স্ত্রী আই.ভি রহমানকে ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য চাপিতলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত মোখছেদুর রহমান তাঁকে ভারতের আগরতলায় নিরাপত্তা হেফাজতে রেখেছিলেন। যদি সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনায় জনগণের সুবিধার্থে সর্ববৃহৎ মুরাদনগর উপজেলাকে বিভক্ত করেন তাহলে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের প্রয়াত স্ত্রী আই.ভি রহমান ও চাপিতলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত মোখছেদুর রহমানের আত্মার শান্তির লক্ষ্যে চাপিতলা গ্রামেই নতুন থানা হবে-ইনশাল্লাহ।
সরকার নতুন থানা করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাঙ্গরা পশ্চিম ইউপি চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন অঞ্জন জানান, উত্তর মুরাদনগরের মধ্যবর্তী সেন্টার হচ্ছে দীঘির পাড়। যদি জনগণের সুবিধার্থে সর্ববৃহৎ মুরাদনগর উপজেলাকে বিভক্ত করেন তাহলে আমরা বিনামূল্যে জায়গা দিব, জনগণ সেবা পাবার মতো যা’ দরকার ব্যক্তিগত উদ্যোগে তা’ করা হবে।
এ দিকে বাঙ্গরা গ্রামে নতুন থানা করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন আওয়ামীলীগ নেতা সওদাগর আব্দুল হাকিম মাষ্টার। তিনি বলেন, আমরা ১৯৭৪ সাল থেকে তৎকালীন এমপি প্রয়াত ডাক্তার ওয়ালী আহাম্মদের নেতৃত্বে বাঙ্গরা পূর্ব ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান ও আওয়ামীলীগের প্রয়াত নেতা চান মিয়া এলাকাবাসীর মতামত নিয়ে এ দাবীর সমর্থন করা হয়েছিল। বর্তমানেও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও মুরাদনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম সরকারের নেতৃত্বে বাঙ্গরা গ্রামে নতুন থানা করতে আমরা ঐক্যবদ্ধ।
অপর দিকে মুরাদনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব হারুন আল রশীদ বলেন, গত ৮নভেম্বর কুমিল্লা জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও আইজিপির উপস্থিতিতে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। তা ছাড়াও বৃহত্তম এ থানা ভৌগলিক কারনেও দু’ভাগে বিভক্ত করা প্রয়োজন। বর্তমানে মুরাদনগর থানায় পর্যাপ্ত পরিমান কর্মকর্তাসহ পুলিশ ও গাড়ী না থাকায় আইন-শৃঙ্খলা সামাল দিতে কষ্ট হচ্ছে। আর মাদকের কারনেও যুব সমাজ ধ্বংস হতে চলছে। তাই আইন-শৃঙ্খলার উন্নতিকল্পে জরুরী ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বিভাগের সর্ববৃহৎ কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলাটি ভেঙ্গে উত্তরাঞ্চলে অচিরেই নতুন থানা স্থাপন প্রয়োজন।
মুরাদনগর উপজেলা কর্মকর্তা এবিএম শওকত ইকবাল শাহীন জানান, বিষয়টির ব্যাপারে কোন প্রকার চিঠিপত্র পাইনি। নতুন থানার স্থান ও নাম নির্ধারন এবং নাম করনের বিষয়টি এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে স্থানীয় জনসাধারণের দাবী প্রশাসনিক থানা, তা’ভবিষ্যতে হতেও পারে। ইতিমধ্যে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ সরেজমিন এসে থানা স্থাপনের কয়েকটি স্থান পরিদর্শন করে দেখে গেছেন।
সহকারী পুলিশ সুপার সার্কেল-বি মোহাম্মদ আয়ুব জানান, মুরাদনগরের উত্তরাঞ্চলে যদি আরেকটি নতুন থানা করা হয়, যেমনি আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি হবে, তেমনি অত্যাচার ও নিপিড়িত লোকজন কিছুটা হলেও উপকৃত হবে। আমরা জায়গা দেখছি-যদি কোন জন-হিতৌশী ব্যাক্তি জমি দান করেন, তাহলে নতুন থানা স্থাপন করতে সহজ হবে।
প্রশাসনিক সূত্র থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রপতির নিকটাত্মীয় হাজী আবুল হাশেমের নামানুসারে ‘হাশেম নগর’ অথবা রাষ্ট্রপতির আরেক নিকটাত্মীয় চাপিতলা ইউনিয়নের পুস্কুরীনীর পাড় গ্রামের প্রয়াত আওলাদ হোসেনের নামানুসারে ‘আওলাদ নগর’ নামে উত্তর মুরাদনগরের ৮/৯টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে প্রস্তাবিত নতুন থানা সহসাই স্থাপন হতে যাচ্ছে। যার ফলে উত্তর মুরাদনগরের সকল লোকজনের মাঝে ফিরে এসেছে প্রাণ চাঞ্চল্যতা।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...