BIGtheme.net http://bigtheme.net/ecommerce/opencart OpenCart Templates
Home / সাহিত্য / অন্যান্য / পিটিয়ে হত্যার প্রবণতা ও আমাদের সামাজিক অবক্ষয়
11

পিটিয়ে হত্যার প্রবণতা ও আমাদের সামাজিক অবক্ষয়

—নাজমুল করিম ফারুক

সামিউল ইসলাম রাজন। বয়স ১৩। বাড়ি সিলেট শহরতলির কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামে। পিতা আজিজুর রহমান, পেশায় মাইক্রোচালক। মা লুবনা বেগম গৃহিণী। দু’ভাইয়ের মধ্যে রাজন বড়। সংসারের অভাব অনটন সিলেট শহরতলীর অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র রাজনের লেখাপড়াকে স্তব্ধ করে দেয়। বাবা আজিজুর রহমানের সাথে হাল ধরে সংসারের। খুব ভোরে ভ্যান নিয়ে বাহির হন সবজি বিক্রি করতে। গত ৮ জুলাই রাজন সবজি বিক্রির জন্য বের হয়ে অন্যান্য দিনের মতো বিকালে ফিরে না আসায় রাতেই রাজনের বাবা-মা জালালাবাদ থানায় ডিজি করতে গিয়ে সারাদিন অজ্ঞাত হিসেবে পড়ে থাকা লাশ সনাক্ত করে নিশ্চিত হন এটি রাজনের লাশ। সন্তানের লাশের পাশে অঝোরে কাঁদতে থাকে বাবা-মা। রাজন ৮ জুলাই নৃশংসভাবে খুন হলেও ১২ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার উপর নির্মম অত্যাচারের ২৮ মিনিটের ভিডিওচিত্র প্রকাশ হলে প্রতিবাদের ঝড় উঠে ফেসবুকে। একে একে খুলতে থাকে রহস্য। গত ৫ দিনে যারা উক্ত হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়েছে তাদের মাথায় আকাঁশ ভেঙ্গে পড়ে। এলোমেলো হয়ে যায় হিসাব-নিকাশ। জনসম্মুখে উঠে আসে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি।

Photo-Paper
১৩ জুলাই দেশের সকল পত্রিকায় খবরটি প্রথম পাতায় স্থান পাওয়ায় টেকনাফ থেকে তেতুঁলিয়া পর্যন্ত আলোচনার বিষয় হয় রাজন হত্যার ভয়ংকর কাহিনী। ঐ রাতে ফেসবুকে ভিডিও ফুটেজটি দেখার সময় আমার শরীরের প্রতিটি লোম শিউরে উঠে। এক পর্যায়ে আমি ফুটেজটি ক্লোজ করে দিতে চাইলেও আমার স্ত্রী সম্পূর্ণ ভিডিওটি দেখে এবং এক পর্যায়ে কেঁদে উঠে। শুধু আমার স্ত্রী নয়; আমার সাড়ে ছয় বছরের কন্যাও কেঁদেছে। আমার বিশ্বাস যারা এ ভিডিও ফুটেজটি দেখেছেন সবাই কেঁদেছেন। ২৮ মিনিটের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি দোকানঘরের বারান্দার রাজনকে খুঁটিতে বেঁধে রেখে পিটিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হচেছ। রাজনও তার উত্তর দিচেছ। মারধরের সময় রাজনের আর্তচিৎকার এবং নির্যাতকারীদের অট্টহাসি ও নানা কটুক্তি শোনা যায়। রাজনের নখ, মাথা ও পেটে রোল দিয়ে আঘাত করার পাশাপাশি বাঁ হাত ও ডান পা ধরে মোচড়াতেও দেখা যায়। এক পর্যায়ে উক্ত স্থান থেকে রাজনকে অন্যস্থানে নিয়ে পূর্ণরায় খুঁটির সঙ্গে বেঁধে আরেক দফা পেটানো হয়। যন্ত্রণার শেষ সীমানায় যখন রাজন পৌছে তখন বলতে শোনা যায়, আমাকে আর মারেন না, আমাকে পুলিশে দিয়ে দেন। ও সময় একজনকে বলতে শোনা যায়, আমিই পুলিশ। নির্যাতনের ভার বইতে না পেরে এক সময় রাজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। রাজনের মৃত্যু নিশ্চিত হলে নির্যাতকারীরা লাশ গুম করতে চেষ্টা চালালে স্থানীয় জনতা লাশবহনকারী মাইক্রোবাস (ঢাকা-মেট্রো-চ-৫৪-০৫১৬) ও দুইজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। এরপর অন্য রকম এক খেলার আবির্ভাব হয়।
এদিকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্যাতন ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে রাজনের মৃত্যু হয়েছে। আরো বলা হয়, রাজনের শরীরে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এরমধ্যে সর্বোচ্চ ৭ ইঞ্চি ও সর্বনিম্ন ২ ইঞ্চি লম্বা চিহ্ন রয়েছে। রাজনের হাত, পা, ঊরু, মাথা, কপাল, বুক ও পেটে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। একটা ১৩ বছরের শিশুর শরীরের এমন কোন স্থান নেয় যেখানে আঘাত করা হয়নি। স্থানীয় একটি গ্যারেজ থেকে ভ্যান চুরি করেছে এমন অভিযোগ এনে রাজনের উপর এই নির্মম অত্যাচার চালানো হয়। রাজনের হত্যাকান্ড নিয়ে যখন সমগ্র বাংলাদেশে তোলপাড় চলছে, ৬৪টি আঘাতের বিনিময়ে ৬৪ জেলায় বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালিত হচ্ছে তখন বিভিন্ন পত্রিকায় (১৪ জুলাই থেকে ১৭ জুলাই) দেখা যায়, পিটিয়ে হত্যার মহোৎসব।
কুমিল্লার মুরাদনগরে যুবকে পিটিয়ে হত্যা, টাঙ্গাইলের সখীপুরে ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা, গাইবান্ধার গোবিন্দপুরে গৃহবধুকে পিটিয়ে হত্যা, রাজবাড়ী গোয়ালন্দে ছাত্রলীগ নেতাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা, বরিশালের হিজলায় তিন জনকে পিটিয়ে হত্যা, নারায়নগঞ্জের সিদ্দিরগঞ্জে গার্মেন্ট শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা, তিনস্থানে গৃহবধুকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধে হত্যা, নওগাঁও রানীনগরে গৃহবধুকে পিটিয়ে হত্যা, সাভারে যুবককে পিটিয়ে হত্যা, নোয়াখালীতে প্রবাসীর স্ত্রীকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মামলার বাদীকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা। অর্থ্যাৎ একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার মহোৎসব দেখে যে কেউ বলবে এখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে বসবাস করা কতটা যন্ত্রণাদায়ক। আমরা প্রতিদিন পিটিয়ে মারার যেসব খবর পাই, সেগুলো একদিক থেকে যেমন বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিন্তু অন্য বিবেচনায় সেগুলো বিচ্ছিন্ন বলে ভাবার অবকাশ নেই। চোর, ডাকাত বা পরকীয়ার অজুহাতে যেসব পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে সেখানে ভিন্নধারার মন্তব্যও পাওয়া যায়। প্রায়ই আমরা এ ধরনের ঘটনাকে ‘গণপিটুনি; বলে বর্ণনা করতে শুনি। কিন্তু আসলে কি তা-ই?
একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সর্বসাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬৮ জন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১০ সালে ১৬৭ জন, ২০১১ সালে ১৪৫ জন, ২০১২ সালে ৯৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১২৩ জন পিটিয়ে হত্যার শিকার হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার হিসাব মতে, গত ৫ বছরে দেশে ৬১৯ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১০ সালে ১২৭ জন, ২০১১ সালে ১৩৪ জন, ২০১২ সালে ১২৬ জন, ২০১৩ সালে ১২৭ ও ২০১৪ সালে ১০৫ জন নিহত হন। এবছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে গণপিটুনিতে মারা গেছেন ৬৬ জন। পরিসংখ্যানে জানা যায়, এবছর সবচেয়ে বেশি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে; ৩২ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে ১৪ জন এবং খুলনা বিভাগে ১১ জন নিহত হন। আমাদের মনুষ্যত্ব যে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে কেউ যানে না।
বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিকের ভাষায়, আমরা বোধ হয় আমাদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছি। যখন পদের ও ক্ষমতার জন্য আইনের তোয়াক্কা করি না, তখন সাধারণ মানুষই কেন আইনের তোয়াক্কা করবে? মানুষ প্রতিবাদ পর্যন্ত করছে না, বাধা দিচ্ছে না। আমরা বোধ হয় পৈশাচিকতা থেকে আর বের হতে পারব না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মনিরুল ইসলাম খানের মতে, সমাজে মানবিক মূল্যবোধ, স্নেহ, মায়া-মমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। পারিবারিকভাবে সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়নীতিভাবে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে এমন বর্বর হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপরাধীদের গ্রেফতারের মাধ্যমে প্রকাশে বিচারকার্য করা যেতে পারে।
জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলীর ভাষায়, দেশে শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের যথাযথ বিচার হচ্ছে না। কিছু খুনের ঘটনায় অপরাধীদের ফাঁসি হলেও বছরের পর বছর সেই রায় কার্যকর হয় না। রাজনকে পিটিয়ে হত্যার দৃশ্য খুনিরা ভিডিও করে যে উল্লাস করে এতে অপরাধ ক্রমশঃ বাড়বে। তাই হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এমন নৃশংস ঘটনা সমাজে কমে আসবে।
পিটিয়ে সাপ বা শিয়াল মারার মধ্যেও হিংস্রতা থাকে। সেই হিংস্রতা যখন মানুষ হত্যার খাতে বয়ে যায়, তখন আমরা চমকে উঠি। বীর আর কসাইয়ের মধ্যে পার্থক্য খুঁজি। মানব কাতারে দাঁড়িয়ে আওয়াজ তুলি, বিক্ষোভ সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান করি, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করি। আরেকটা ঘটনার জন্ম হলে আগের ঘটনাটি ভুলে যাই। এটাই আমাদের প্রকৃত বাস্তবতা। তাহলে কি আমাদের সমাজ বিবেকবর্জিত হয়ে পড়েছে? সামাজিক সম্পর্ক, মানুষের মধ্যকার দূরত্ব, আত্মপায়ণতা কি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে? পশুর মতো মানুষ হত্যার চিত্র কি আজ আমাদের নিত্যসঙ্গী? মানুষের বিবেকবোধ, মনুষ্যত্ব কী আজ অনেক নীচে নেমে গেছে? ক্ষমতাবান বিকৃত মানুষের উল্লাস আর পাশবিকতার রাজত্ব কি বড়? মুখোশধারী অমানুষ পাষণ্ডের সংখ্যাই কি এদেশে বেশি? আমাদের ভেতরে কি দানবপ্রবৃত্তিরা এখনো সক্রিয়? বিবেকবোধ মানবিকতা কি ব্যক্তি ও সমাজ থেকে উঠে গেছে? মানুষ কি ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হচ্ছে পশুতে, পিশাচে?
আমরা জানি, কাউকে পিটিয়ে মারার ক্ষমতা বা অধিকার রাষ্ট্র দেয়নি এবং এটা সভ্য সমাজে চলতে পারে না, চলতে দেয়া যায় না। এর ফলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, পদদলিত হয় মানবিক মূল্যবোধের। বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজনৈতি থেকে শুরু করে সামাজিকসহ এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে অবক্ষয়ের আঁচড় লাগেনি। এ অবক্ষয় ইদানিং আরো প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। সামাজিক ও ব্যক্তি নিরাপত্তা আজ ভূলুষ্ঠিত। দেশের সামগ্রিক যে অবক্ষয়ের চিত্র এর থেকে পরিত্রাণের কোনো পথই কি আমাদের খোলা নেই? আমাদের অতীত বিস্মৃতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, বর্তমান অনিশ্চিত এবং নিরাপত্তাহীনতার দোলাচলে দুলছে এবং ভবিষ্যৎ মনে হচ্ছে যেন পুরোপুরি অন্ধকার। অথচ আমরা উন্নত দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার স্বপ্ন দেখছি।
যারা সমাজকে, রাষ্ট্রকে পদে পদে কলুষিত করছে, সমাজকে ভারসাম্যহীন ও দূষিত করে তুলছে, সমাজের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষুণœ করছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। দেশের আনাচে কানাচে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আত্মসচেতনতা ও নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তা না হলে, এদেশের ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠার সব আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও প্রকাশে পিটিয়ে মারার পৈশাচিক বর্বরতার ঘটনা সমাজদেহে নির্দয়তার যে ব্যাধি বাসা বেঁধেছে সে বিষয়ে সকলকে গভীরভাবে ভাবতে হবে; তা না হলে এই ব্যাধি আমাদের দেশ ও সমাজের যে ইতিহাস ঐতিহ্য আছে তার মৃত্যু ঘটাবে। পিটিয়ে হত্যার অপসংস্কৃতি থেকে সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে।
=========================
নাজমুল করিম ফারুক
সাধারণ সম্পাদক, তিতাস প্রেসক্লাব
কড়িকান্দি বাজার, তিতাস, কুমিল্লা।
মোবাইল : ০১৮১৮-০০৪২৭২
ই-মেইল : nazmulkf09@gmail.com

Check Also

debidwer (Comilla) fire pic-24.03.2019

দেবিদ্বারে অগ্নিকান্ডে ১কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ– কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামে রান্না ঘরের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরনে ১৫টি ...