BIGtheme.net http://bigtheme.net/ecommerce/opencart OpenCart Templates
Home / শিক্ষাঙ্গন / অসদুপায় অবলম্বন ও আমাদের শিক্ষার মান

অসদুপায় অবলম্বন ও আমাদের শিক্ষার মান

প্রসঙ্গ: জেএসসি/জেডিসি পরীক্ষায়
মো. আলী আশরাফ খান :
যদিও সরকার বলছে শিক্ষার মান উন্নয়ন হয়েছে-হচ্ছে। আসলে শিক্ষার মান যে উন্নয়ন হয়নি এটির জলজ্যান্ত প্রমাণ জেএসসি/জেডিসি-এর মত একটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠান। এবছর এই প্রথম দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হল জেএসসি/জেডিসি পরীক্ষা-২০১১। এ নতুন ধারার পরীক্ষাটি ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য যেমন নতুন ও ব্যতিক্রমী ছিল তেমনি অভিভাবকদের জন্যও ছিল চিন্তার কারণ। তারপরও সরকার যথেষ্ঠ আন্তরিক ছিল এ পরীক্ষা অনুষ্ঠানকে ঘিরে। কিন্তু দেশের ভিবিন্ন স্থানে ঘটেছে বিভিন্ন রকম অপ্রীতিকর ঘটনা-শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অসুদপায় অবলম্বন করার ফলে। আমরা পত্র-পত্রিকায় দেখেছি দেশের বিভিন্ স্থানে বেশ কিছু পরীক্ষার্থী ও শিক্ষক পর্যন্ত বহিস্কার হয়েছে। এটি কিন্তু সত্যি সত্যিই আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য অশুভ সংকেত বহন করে।

দেশের অন্যান্য স্থানের মতো জেএসসি/জেডিসি পরীক্ষায় আমাদের বৃহত্তর দাউদকান্দি উপজেলার বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোয় বিস্তর অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে। ১ নভেম্বর পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশেষ করে মাদরাসা কেন্দ্রগুলোয় অনিয়মের খবর পাওয়া যায়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের সাহেবের শিক্ষার প্রতি আন্তরিকতার কারণে প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের পূর্বে শিক্ষার মান সংরক্ষণ ও নকল প্রতিরোধ আন্দোলনের আহ্বায়ক ও কিছু তুখোড় সাংবাদিকদের অনুমতি দিয়ে থাকেন পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের। তারা পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শণ-পর্যবেক্ষণ শেষে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনার খবর সংগ্রহ করেণ-স্থির চিত্রসহ।

১ নভেম্বর উপজেলার দশপাড় হযরত কবির উদ্দিন কামিল মাদরাসায় পরীক্ষা পরিদর্শণে গেলে দেখা যায়, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের প্রতিনিধি মহিলা বিষয়ক উপজেলা কর্মকর্তা অফিস কক্ষে বসে কথা বলছেন। গেট দিয়ে ঢুকার পর তিনি আমাদের পরিচয় পেয়ে বললেন, ‘আপনারা একটু বসুন। আমি কক্ষগুলোর অবস্থা দেখে এসে আপনাদেরকে নিয়ে যাবো। সাংবাদিকগণ বুঝে নিলেন. তিনি পরীক্ষার্থীদের সাবধান! করে এসে আমাদেরকে ভালোকিছু উপহার দেয়ার জন্যই এ কৌশল হয়ত এঁটেছেন। সাংবাদিকগণ চলে এলেন। পরে অবশ্য হল সুপার তাদের ভুল বুঝতে পেরে তাদেরকে ডাকাডাকি করেন।

এমনি করে প্রায় সব ক’টি হলের অবস্থা ছিল নাজুক। পরীক্ষার্থীরা একে অপরের খাতা দেখে লিখলেও শিক্ষকরা বরাবার উৎসাই জুুগিয়েছেন। কখনও কখনও শিক্ষকরা নিজেরাই পরীক্ষার্থীদের খাতায় লিখে দিতে দেখা গেছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের উপদ্রোপ ছিল চোখে পড়ার মত। বিশেষ করে হাইওয়ে সড়ক থেকে দূরবর্তী কেন্দ্রগুলোতে অনিয়ম বেশি হয়েছিল-প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বেশি একটি উপস্থিত না থাকার কারণে। আবার এমনও দেখা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণও সঠিক দায়িত্ব পালনে উৎসাহী ছিলেন না।

১৫ নভেম্বর মঙ্গলবার উপজেলার দশপাড়া হযরত কবির উদ্দিন কামিল মাদরাসায় চলমান জেডিসি পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পরীক্ষার্থীরা একে অপরের খাতা দেখে পরীক্ষা দিচ্ছে। ওই পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রায় সব ক’টি রুমে শিক্ষকদের উপস্থিতিতে ছাত্রছাত্রীরা একে অপরের খাতা দেখে দেদারছে পরীক্ষা দিলেও দায়িত্বপ্রাপ্তরা ছিলেন ভাবলেশহীন। মোটকথা, দাউদকান্দি উপজেলার প্রায় সবক’টি পরীক্ষা কেন্দ্রের অবস্থা একই রকম ছিল। ওইসব পরীক্ষা কেন্দ্রে পাশের হার বাড়ানোর লক্ষ্যে শিক্ষকরা মরিয়া হয়ে অভিনব এ অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেন।

এছাড়াও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ও হল সুপারগণ ‘ধরি মাছ নাই ছুঁই পানি’ আদলের দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষার্থীরা একে অপরের খাতা দেখে লিখলে এবং শিক্ষকগণ অনিয়ম করলেও তারা উলেখযোগ্য কোনো ভূমিকা পালন কনেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে টু পাসের বিনিময়ে সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। শুৃধু তাই নয়, সংবাদকর্মীরা প্রায় প্রতিটি কেন্দ্র থেকে অসদুপায় অবল্বনরে চিত্র ও ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষণ করেছেন। এমনি একটি চিত্র কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে।

দশপাড়া কেন্দ্রের ঘটনা সম্পর্কে হল সুপারের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমি হল সুপারের দায়িত্ব নিতে চাইনি, আমাকে একরকম জোর করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি কেন্দ্রের বারান্দায় সবসময় ঘোরাফেরা করি এবং যতটুকু সম্ভব সঠিক দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করে আসছি। এ পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধি উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সঙ্গে মুঠোফেনে কথা হলে তিনি বলেন,‘ আমার জরুরি কাজ থাকায় আমি ইউএনও সাহেবকে জানিয়েই বাহিরে ছিলাম’। বিষয়টি নিয়ে দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার -এর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি মুঠোফোনে বলেন, বিষয়টি আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছি এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছি ’।

আমরা সামগ্রীক বিষটি নিয়ে অত্যন্ত মর্মাহত-আশাহত। দেশে ’৭০ দশ থেকে নকল শুরু হলেও ৮০ দশকের পর নকলের মহোৎসব শুরু হয়। এ মহাব্যাধি একপর্যায়ে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রকে এক ভয়াবহতার দিকে ািনয়ে যায়। এ ব্যাধি আমাদের জাতির ললাটে কলঙ্কতিলক লেপন করে শিক্ষাক্ষেত্রকে মহাবিপর্যয়ে পর্যবসিত করে। এ বিপর্যয় থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে আইনও প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু— দুঃখের বিষয়, ওই আইনটির যথাযথ প্রয়োগ হয়নি। যে কারণে, ছাত্রছাত্রীদের প্রকৃত মেধা ও মননের বিকাশ ঘটেনি, পৌছেনি কাংখিত পর্যায়ে।

ওই দীর্ঘসময়ে আমাদের দেশের শিক্ষার মান অনেকটা নিচে নেমে এসেছিল। লজ্জাজনক পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছিল ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক এবং রাষ্ট্রীয় কর্ণধাররাও। আর এ ভয়াবহতা বা অবক্ষয়ের জন্য আমরা অনেকেই ছাত্রছাত্রীদেরকে দায়ি করা হত। অথচ, এর জন্য অভিভাবক, শিক্ষক সর্বোপরি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও কম দায়ি ছিল না। এদেশের ভ্রান্তধারার রাজনীতি চর্চার ফলেই প্রায় সকল ক্ষেত্রের মত শিক্ষা ক্ষেত্রেরও অধঃপতন হয়েছিল। এসব রাজনীতির ছত্রছায়ায় ব্যক্তি-দল এবং যারা ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল, তারাও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে সাধারণ জনগণকে এমন কিছু অপকৌশলের জালে আবদ্ধ করে ফেলে, যা থেকে বেরুনো সম্ভব হয় না। যদিও কিছু ভালো কাজ করতে কোনো ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনের কেউ এগিয়ে আসে তাহলে তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, অনেক সময় নিজেদের জীবন পর্যন্ত বিসর্যন দিতে হয়।

তবে নকল প্রতিরোধ তথা বন্ধের ক্ষেত্রে ওইসময়ে সরকারের ভূমিকা সত্যি সত্যিই ছিল প্রশংসনীয়। এ ক্ষেত্রে ‘ছাত্রবন্ধু মিয়া আবদুললাহ ওয়াজেদ’-এর কথা সর্বপ্রথমে বলতে হয়। তিনি ব্যবসায়ী হয়েও দেশের শিক্ষাক্ষেত্রকে মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে নকলমুক্ত পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ দেশব্যাপী জোরালো আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এর ফলে এবং সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছিল দেশে নকলমুক্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষ্টির। এখন এসএসসি পরীক্ষায় নকল প্রবণতা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে বহিস্কারের সংখ্যাও অনেকে কমে গেছে। অন্যদিকে বাড়ছে পাসের হার এবং জিপি-এ- ৫। বাড়ছে মেয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও। এবার জেএসসি/জেডিসিতে উলেখ্য পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।

যদিও নকল বিরোধী আন্দোলন শুরু হবার পর প্রথম কয়েক বছর এসএসসি’র ফলাফল খারাপ হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে ভাল ফলাফল পেয়েছি আমরা। যা দেশ ও জাতির জন্য এক নতুন মাত্রার যোগ করেছে। ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে এখন তো অভাবনীয় পর্যায়ে এসেছে।

এতে সহজেই বোঝা যায়, শিক্ষার্থীরা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন পাঠে অধিক মনোযোগী। সঙ্গে সঙ্গে নকল প্রবণতা কমার কারণে বহিস্কারের সংখ্যাও অনেক কমেছে। যা আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। যদিও আমরা ’৯৯ সাল থেকে শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি কিন্ত ২০০৩ সাল থেকে আমরা দাউদকান্দির প্রায় পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করে যাচ্ছি। ওইসময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছু অনিয়ম লক্ষ্য করলেও ২০০৬ সাল থেকে ’১০ ইং সাল পর্যন্ত প্রায় নকলমুক্ত পরিবেশে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা দিতে দেখেছি। দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলেই সঠিক দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০১০ ও ’১১-এর পরীক্ষাগুলোয় এসে বেশ কিছু অনিয়ম লক্ষ্য করা যায়। আমরা আশা করবো, সমাপনী ও নিকটবর্তী এসএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যেনো সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করেন। দাউদকান্দির সবক’টি ক্রেন্দ্রর কর্তাব্যক্তিরা অনিয়ম-অসদুপায় অবলম্বন করবেন না বলেই আমাদের বিশ্বাস। নিজেদের ভুল-ত্র“টিগুলো শুধরে পরীক্ষার্থীরদের কল্যাণের জন্যই প্রসংশনীয় ভূমিকা রাখবেন তারা। মনে রাখতে হবে, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের শিক্ষার মান সংরক্ষণ-শিক্ষার মান বৃদ্ধিকরণে সর্বঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। আমরা চাই, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দাউদকান্দির শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার অবস্থান এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছুক-যেনো সমগ্র দেশবাসী আমাদেরকে মডেল হিসেবে অনুসরণ-অনুকরণ করে সুফল ভোগ করতে পারে।

লেখকঃ
আহ্বায়ক,শিক্ষার মান সংরক্ষণ ও নকল প্রতিরোধ আন্দোলন,বৃহত্তর দাউদকান্দি, কুমিলা।

Check Also

345554

দেবিদ্বারে মাদ্রাসার ফলাললে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে : পিছিয়ে কলেজ

দেবিদ্বার প্রতিনিধি :– কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলায় এবারের এইচ এস সি ও আলিম পরীক্ষায় মোট জিপিএ-৫ ...

Leave a Reply